বেগমগঞ্জে চলতি আগস্ট মাসের প্রথম ২২ দিনে ছয়টি পৃথক গুলিবর্ষণের ঘটনা রেকর্ড হয়েছে। নোয়াখালীর এই উপজেলায় সংঘটিত হামলাগুলোতে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন অন্তত ১১ জন। আহতদের মধ্যে রয়েছেন স্কুলশিক্ষক, রাজনৈতিক নেতা ও ব্যবসায়ী। তবে একের পর এক এমন সহিংসতা ঘটলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এখন পর্যন্ত কোনো সন্দেহভাজনকে আটক করতে পারেনি। উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি কোনো অবৈধ অস্ত্রও।

উপজেলার আলাইয়ারপুর, গোপালপুর, চৌমুহনী পৌরসভার হকার্স মার্কেট এবং বাংলাবাজার—এই চারটি এলাকায় পরপর গুলির ঘটনা ঘটেছে। সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের পেছনের সুনির্দিষ্ট কারণ, দায়ী ব্যক্তি কিংবা অস্ত্রের উৎস সম্পর্কে পুলিশ স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেনি। যদিও হামলার শিকার ব্যক্তিদের বক্তব্য অনুসারে, আধিপত্য বিস্তার, পূর্বশত্রুতা ও রাজনৈতিক বিরোধই এসব ঘটনার মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

সবচেয়ে সাম্প্রতিক ঘটনাটি ঘটে গত শনিবার রাতে। জিরাতলী ইউনিয়নের বাংলাবাজারে রাত সাড়ে ১০টার দিকে হঠাৎ অস্ত্রধারীরা এসে এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়ে এবং ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায়। হামলাকারীরা সবাই মুখোশ পরা ছিল। বাজারের ব্যবসায়ীদের বর্ণনা অনুযায়ী, ১০ থেকে ১২ জন অস্ত্রধারী পূর্ব গলি দিয়ে নোয়াখালী-লক্ষ্মীপুর প্রধান সড়কে প্রবেশ করে। প্রথমে কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরিত হয়। এরপর তারা নির্বিচারে গুলি চালাতে থাকে। এতে সড়কে চলাচলরত স্কুলশিক্ষক রাজিবুজ্জামান এবং দোকানের কর্মচারী সাকিব ও নাজিম গুলিবিদ্ধ হন।

এর আগে ৬ আগস্ট মধ্যরাতে চৌমুহনী হকার্স মার্কেটে প্রথম গুলির ঘটনা ঘটে। জেলা বিএনপির সাবেক ধর্মবিষয়ক সম্পাদক আবুল কাশেমকে লক্ষ্য করে মোটরসাইকেলে আসা দুই দুর্বৃত্ত গুলি চালায়। সেই গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে পাশে থাকা বিএনপি নেতার সহযোগী ও ওষুধ ব্যবসায়ী ইয়াসিন সেন্টুর পেটের বাঁ দিকে বিদ্ধ হয়। তিন দিন পর ৯ আগস্ট সন্ধ্যা পৌনে ৭টার দিকে গোপালপুর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের রসুলপুর গ্রামে ওয়ার্ড যুবদল নেতা সোহাগ হোসেন সোহেলকে লক্ষ্য করে গুলি করা হয়। বেশ কিছু ছররা গুলি তার কোমরের বাঁ পাশে ও পিঠে লাগে।

১২ আগস্ট রাত ৯টার দিকে আরেকটি ঘটনা ঘটে। চন্দ্রগঞ্জ পূর্ববাজার থেকে বাজার করে ভাড়া বাসায় ফিরছিলেন রাব্বি হোসেন ওরফে রাকিব (২২)। আলাইয়ারপুর ইউনিয়ন পরিষদ-সংলগ্ন এলাকায় পৌঁছালে চার তরুণ তার অটোরিকশার গতি রোধ করে। পরে নির্জন স্থানে নিয়ে গিয়ে এক লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তার কাছ থেকে নগদ ১ হাজার ৫০০ টাকা ও মুঠোফোন ছিনিয়ে নেওয়া হয়। পরবর্তীতে ডান পায়ের হাঁটুর পাশে তাকে গুলি করা হয়।

১৭ আগস্ট আলাইয়ারপুর ইউনিয়নের মোশকপুর গ্রামের গাজীটোলা এলাকায় আরেকটি গুলিবর্ষণ ঘটে। এতে পাঁচজন আহত হন। আহতরা একটি অনুষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানের কর্মী এবং জামায়াতের রাজনীতিতে সক্রিয়। তারা গায়েহলুদের একটি অনুষ্ঠানে যাচ্ছিলেন। নজরুল ইসলাম নামের একজন আহত ব্যক্তি জানান, তিনটি মোটরসাইকেল ও দুটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে তারা যাত্রা করছিলেন। পেছন থেকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয়। মোটরসাইকেল থেকে পড়ে যাওয়ার পর তাদের মাথা, হাত ও পিঠে গুলি লাগে।

স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা দাবি করছেন, সন্ত্রাসীরা রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আলাইয়ারপুর ইউনিয়ন বিএনপির একজন নেতা প্রথম আলোকে জানান, বেগমগঞ্জের পশ্চিমাঞ্চলে অবৈধ অস্ত্রধারীদের তৎপরতা নতুন নয়। পেশাদার সন্ত্রাসীরা ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ হয়ে কাজ করে এবং সেই পরিচয়ে অপরাধ করে। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর এক ধরনের গা-ছাড়া মনোভাবের কারণে ছয়ানী, আলাইয়ারপুর, আমানউল্যাহপুর ও গোপালপুর—এই চারটি ইউনিয়নে সন্ত্রাস বন্ধ হচ্ছে না। অস্ত্রধারীদের প্রকাশ্য তৎপরতায় স্থানীয় মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।

উপজেলা বিএনপির সভাপতি কামাক্ষ্যা চন্দ্র দাশ প্রথম আলোকে বলেন, অস্ত্রধারীদের গ্রেপ্তার ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে পুলিশের তৎপরতায় তারা হতাশ। একের পর এক ঘটনা ঘটলেও পুলিশ কাউকে আটক করতে পারছে না। ফলে সন্ত্রাসীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। তিনি আরও বলেন, প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও প্রকৃত অপরাধীদের শাস্তি প্রয়োজন। অস্ত্রধারী যে দলেরই হোক, তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে। বিএনপির পক্ষ থেকে কোনো সন্ত্রাসীর জন্য সুপারিশ করা হবে না।

অপরদিকে, বেগমগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. শামসুজ্জামান জানান, সাম্প্রতিক গুলির ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তারে পুলিশের কোনো আন্তরিকতার অভাব নেই। নিয়মিত অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, এসব ঘটনার পেছনে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা রয়েছে, যা অপরাধীদের আত্মগোপনে সাহায্য করছে। পুলিশ নিরপেক্ষভাবে তাদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। উপজেলায় তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসীর সুনির্দিষ্ট কোনো তালিকা নেই। তবে পশ্চিমাঞ্চলের ছয়ানী, আমানউল্যাহপুর, গোপালপুর, আলাইয়ারপুর এবং পূর্বাঞ্চলের হাজিপুর ও চৌমুহনী পৌর এলাকায় সন্ত্রাসীদের আনাগোনা ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সবচেয়ে বেশি বলে তিনি জানান।