পুরান ঢাকার মাহুতটুলীতে ১৯৪১ সালে জন্ম নেওয়া বশীর আহমেদের খেলোয়াড় জীবনের শুরুটা স্কুল মাঠ থেকেই। মাহুতটুলী ও আরমানিটোলা স্কুলের মাঠে কেটেছে তাঁর শৈশব-কৈশোর। প্রতিদিন ভোরে মাঠে গিয়ে ১৫ থেকে ২০ চক্কর দৌড়াতেন, সাথে চলত অ্যাথলেটিকসের পাশাপাশি হকি, ফুটবল ও ক্রিকেট অনুশীলন। আরমানিটোলা স্কুলের চারটি হাউসের একটি ওয়েস্ট হাউসে ছিলেন তিনি, আর সেই হাউস প্রতিযোগিতাই তাঁর মধ্যে তৈরি করেছিল চ্যাম্পিয়ন হওয়ার জেদ। নিজের ভাষায়, 'কম্পিটিশন করার যে একটা মোহ কিংবা কম্পিটিশন করে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার যে একটা জেদ, ওটা ওইখান থেকেই তৈরি হয়েছে।'
স্কুলজীবনেই অ্যাথলেটিকসে সাফল্য এসেছিল। হাই জাম্প, লং জাম্প, ডিসকাস থ্রো ও শটপুট—সবগুলো ইভেন্টেই অংশ নিতেন। এক আন্তস্কুল প্রতিযোগিতায় কয়েকটি ইভেন্টে দ্বিতীয় হয়েও মোট পয়েন্টে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার অভিজ্ঞতা আছে তাঁর। যদিও পরে অ্যাথলেটিকসকে বেশি সময় দিতে পারেননি, তবু একবার মোহামেডানের রিলে দলে নেমে দলকে চ্যাম্পিয়ন করতে সাহায্য করেছিলেন, সেই সঙ্গে রেকর্ডও গড়েছিল সেই দল।
অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় ক্লাব পর্যায়ে হকি শুরু করেন। ১৯৫৬ সালের দিকে ব্রাদার্স ইউনিয়নের হয়ে মাঠে নামেন, পরের বছর ১৯৫৭ সালে ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং ক্লাবে যোগ দেন। হকিতেই তাঁর সবচেয়ে বড় সাফল্য। ১৯৬২ সালে কেনিয়ার বিপক্ষে পাকিস্তান জাতীয় দলের হয়ে খেলেছেন। সে সময় পাকিস্তান ছিল বিশ্বের অন্যতম সেরা হকি দল। তিনি জানান, 'আমি হকিতে অ্যাটলিস্ট ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়ন টিমে খেলেছি।' গোল করার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল তাঁর। এক ম্যাচে তিনি ট্রিপল হ্যাটট্রিক করেছিলেন। ন্যাশনাল ব্যাংকের হয়ে খেলতে গিয়ে এক ম্যাচে ১৩ গোলও করেছেন। গোল করার দক্ষতা প্রসঙ্গে তাঁর মন্তব্য, 'আমি যেকোনো জায়গা থেকে মারলে অ্যাটলিস্ট পোস্টে যাবে। পোস্টে আমার এমন অবস্থা হয়েছিল যে মারলেই একটা পোস্টে যাবেই। এটা গোল হোক কিংবা না হোক।'
ফুটবলেও কম যায়নি। ১৯৫৯ সালে আগা খান গোল্ড কাপে ভিক্টোরিয়ার খেলোয়াড় হয়েও মোহামেডানের হয়ে খেলেছিলেন, এবং সেই টুর্নামেন্টে মোহামেডান চ্যাম্পিয়ন হয়। ১৯৬৭ সালে ফেনীতে জগন্নাথ কলেজের হয়ে খেলতে গিয়ে পা ভাঙার পর পেশাদার ফুটবল থেকে সরে আসতে বাধ্য হন। ক্রিকেটও দীর্ঘদিন খেলেছেন ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং ক্লাবের হয়ে। একই সময়ে একাধিক খেলা চালিয়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, 'সব খেলাই উপভোগ করতাম, সব খেলাতেই ভালো করার প্রবল ইচ্ছে হতো।'
১৯৫৯ সালে ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানে চাকরি শুরু করেন, যা পরবর্তীতে সোনালী ব্যাংকে রূপ নেয়। সেখান থেকেই ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার হিসেবে অবসর নেন। খেলাধুলার পাশাপাশি চাকরিও সমান তালে চালিয়ে গেছেন। ১৯৫৯-৬০ মৌসুমে ফুটবলে অবদানের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের 'ব্লু' সম্মাননা পান, যা তাঁর ক্রীড়া জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য স্বীকৃতি। ১৯৮০ সালে জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার লাভ করেন এবং বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিবের দায়িত্বও পালন করেছেন।
বাংলাদেশের বর্তমান ক্রীড়াঙ্গন প্রসঙ্গে বশীর আহমেদ মনে করেন, শুধু অর্থ ব্যয় করলেই ভালো খেলোয়াড় তৈরি হয় না। প্রয়োজন প্রতিভা, সঠিক প্রশিক্ষণ, দক্ষ কোচ ও সংগঠক। তিনি পেলে, ম্যারাডোনা ও মেসির মতো বিশ্বমানের খেলোয়াড়দের উদাহরণ টেনে বলেন, এসব খেলোয়াড় তৈরি হয়েছে নিয়মতান্ত্রিক অনুশীলন ও ভালো পরিবেশ থেকে। দেশের ক্রিকেটে সাকিব আল হাসান ও মুস্তাফিজুর রহমানের মতো প্রতিভাবানদের কথাও তিনি মনে করিয়ে দেন। ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর প্রতিক্রিয়া, 'আশাই তো মানুষের জীবন। আশা আছে বলেই তো আমরা আছি। অতীত আছে বলেই তো ভবিষ্যৎ।'



