শৈশবে বন্ধু বানানো ছিল অত্যন্ত সহজ ও স্বতঃস্ফূর্ত। ক্লাসের কারও সুন্দর জ্যামিতি বক্স কিংবা টিফিন পিরিয়ডে একসাথে খেলা করতে গিয়ে সামান্য চোট পাওয়া—এই ছোট ছোট ঘটনাগুলোই হয়ে উঠত গভীর বন্ধুত্বের সূত্র। কিন্তু বয়স বাড়ার সাথে সাথে এই সহজ সমীকরণটি জটিল হয়ে যায়। অনেক সময় একই কোচিং সেন্টারে বা ক্লাসে মাসের পর মাস পাশাপাশি বসেও আমরা কেবল আনুষ্ঠানিক হাই-হ্যালোতেই সীমাবদ্ধ থাকি। এই অস্বস্তিকর নীরবতা ভেঙে কীভাবে প্রকৃত সম্পর্ক গড়ে তোলা যায়, তা নিয়ে আলোকপাত করেছেন মনোবিজ্ঞানীরা।
মনোবিজ্ঞানী এবং 'দ্য ফ্রেন্ডশিপ ফর্মুলা' বইয়ের লেখক কাইলার শুমওয়ের মনে করেন, প্রাপ্তবয়স্করা বন্ধু তৈরির প্রক্রিয়াটিকে নিজেই জটিল করে তোলেন। ছোটবেলায় রুটিনমাফিক একই বয়সের মানুষের সাথে মেশার সুযোগ থাকে, কিন্তু বড় হলে মানুষ নিজের খোলসের ভেতর ঢুকে পড়ে। প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয়ে অনেকেই নতুন কারো সাথে পরিচিত হতে এগিয়ে যান না। অথচ সামাজিক সম্পর্কের অভাব মারাত্মক হতে পারে। ১৯৭৯ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের বন্ধু সার্কেল ছোট, তাদের শারীরিকভাবে সুস্থ থাকা সত্ত্বেও মৃত্যুঝুঁকি অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি।
নতুন বন্ধু তৈরির জন্য বিশেষজ্ঞরা 'লাঞ্চ টেবিল থিওরি'র কথা বলেছেন। এর মূল কথা হলো নিয়মিত একই জায়গায় উপস্থিত থাকা। এটি কোনো বই পড়ার আড্ডা, আর্ট স্কুল, খেলাধুলার ক্লাব বা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন হতে পারে। ক্যানসাস ইউনিভার্সিটির এক গবেষণা অনুযায়ী, দুজন অপরিচিত মানুষের বন্ধু হতে অন্তত ৫০ ঘণ্টা, ভালো বন্ধু হতে ৯০ ঘণ্টা এবং ঘনিষ্ঠ বন্ধু হতে ২০০ ঘণ্টার বেশি সময় একসাথে কাটানোর প্রয়োজন হয়। তবে এই সময়টুকু বাধ্যতামূলক কাজের বদলে নিজের ইচ্ছায় ও আনন্দের সাথে কাটানো জরুরি।
বন্ধুত্ব স্থাপনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় নিজেদের দুর্বলতা প্রকাশ করতে ভয় পাওয়া। মাউন্ট সিনাইয়ের আইকান স্কুল অব মেডিসিনের অধ্যাপক অ্যালান রোজানস্কির মতে, বড়রা মনে করেন কথা শুরু করলে হয়তো সম্মান কমবে, কিন্তু সামান্য দুর্বলতা প্রকাশ করলেই সম্পর্কের জড়তা কাটে। উদাহরণ হিসেবে কাইলার শুমওয়ের জানান, তিনি তার সহপাঠী ড্যানকে সরাসরি বলেছিলেন যে তিনি নতুন বন্ধু বানাতে জানেন না এবং ড্যানের বন্ধু হতে চান। এই অকপট স্বীকারোক্তিই তাদের আজ সেরা বন্ধু করে তুলেছে।
এর পেছনে কাজ করে মস্তিষ্কের 'মিয়ার-এক্সপোজার ইফেক্ট'। কোনো পরিচিত মুখ বারবার দেখলে মস্তিষ্ক তাকে নিরাপদ তালিকায় রাখে এবং মায়া জন্মে। এছাড়া একসাথে হাসাহাসি বা মজার কাজ করলে মস্তিষ্কে 'অক্সিটোসিন' হরমোন নিঃসৃত হয়, যা পারস্পরিক বিশ্বাস তৈরি করে।
সফলভাবে বন্ধু বানাতে বিশেষজ্ঞরা কিছু বিশেষ পরামর্শ দিয়েছেন। প্রথমত, নিজের পছন্দের কাজ বা শখের জায়গা বেছে নেওয়া উচিত যাতে বন্ধু না হলেও পছন্দের কাজটা করা হয়। দ্বিতীয়ত, অপরিচিতদের স্বাগত জানানো এবং সাধারণ কুশল বিনিময়ের চেয়ে গভীরে গিয়ে কথা বলা (যেমন- প্রিয় মুভি বা সিরিজ নিয়ে আলোচনা) কার্যকর। এছাড়া অন্তত তিনবার চেষ্টা করার পর কেউ আগ্রহী না হলে পিছু হটার পরামর্শ দিয়েছেন শুমওয়ে।
কিছু বিষয়ে সতর্ক করে বলা হয়েছে, আড্ডার সময় স্মার্টফোনে মুখ গুঁজে থাকলে কেউ কথা বলতে আসবে না। পাশাপাশি, অন্যের বদনাম করে সাময়িক আড্ডা জমানো গেলেও দীর্ঘমেয়াদী বিশ্বাস তৈরি হয় না। নিজেকে নিখুঁত প্রমাণ করার চেষ্টা না করে স্বাভাবিক থাকাই শ্রেয়, কারণ মানুষ নিখুঁত ব্যক্তির চেয়ে সহজ মানুষকে বেশি পছন্দ করে। পরিশেষে, এমন পরিবেশ বেছে নিতে হবে যেখানে বারবার দেখা হওয়ার সুযোগ থাকে, কারণ বন্ধুত্বের মূল রহস্যই হলো নিয়মিত সাক্ষাৎ ও সময়ের আদান-প্রদান।




