ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন অশোক কুমার, যাকে অনেকে প্রথম ভারতীয় সুপারস্টার হিসেবে গণ্য করেন। তাঁর জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে বলিউডের এই কিংবদন্তি ব্যক্তিত্বের জীবন ও কর্মময় দিনগুলোকে নতুন করে স্মরণ করা হচ্ছে। মুকুন্দলাল গঙ্গোপাধ্যায় নামে ১৯১১ সালের ১৩ অক্টোবর বিহারের ভাগলপুরে জন্মগ্রহণ করা এই মহান শিল্পীকে পারিবারিকভাবে 'দাদামণি' বলে ডাকা হতো। তাঁর বাবা একজন আইনজীবী ছিলেন এবং তিনি চেয়েছিলেন বড় ছেলে হিসেবে অশোকও আইনের পেশায় আসীন হোন। এই লক্ষ্যেই তাঁকে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি করানো হয়েছিল। তবে পরীক্ষার ব্যর্থতা এবং বাবার ভয়ে বাড়ি ফিরতে না পারার ঘটনাটি তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। সেই সময়ে মুম্বাইয়ে বোনের বাড়িতে অবস্থানকালে হাতখরচের প্রয়োজনে বোম্বে টকিজে ল্যাব সহকারীর কাজ শুরু করেন তিনি এবং সেখান থেকেই রুপালি পর্দার প্রতি তাঁর প্রবল অনুরাগ জন্মে।

অশোক কুমারের অভিনয় জীবনে প্রবেশ ছিল অত্যন্ত নাটকীয়। বোম্বে টকিজের 'জীবন নাইয়া' ছবির শুটিং চলাকালীন প্রধান নায়ক নাজম-উল-হাসান অভিনেত্রী দেবিকা রানীকে নিয়ে পালিয়ে যান, যা তৎকালীন সময়ে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। দেবিকা রানীর স্বামী এবং স্টুডিওর মালিক হিমাংশু রায় অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে হাসানকে সরিয়ে দেন। এই শূন্যস্থান পূরণ করতে ল্যাব সহকারী অশোক কুমারের ডাক পড়ে। অন্য একটি প্রচলিত গল্প অনুযায়ী, নায়কের অসৌজন্যমূলক আচরণের কারণে তাঁকে বাদ দেওয়া হয় এবং পরিচালকের আপত্তি থাকা সত্ত্বেও অশোক কুমার তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন। এই অভাবনীয় সুযোগটিই তাঁকে হিন্দি চলচ্চিত্রের মূল ধারায় নিয়ে আসে।

অভিনয় জগতে অশোক কুমার ছিলেন এক অনন্য প্রতিভা। নায়ক, খলনায়ক কিংবা পার্শ্বচরিত্র—সবক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন সমান সাবলীল। সমালোচকদের মতে, তাঁর হাত ধরেই হিন্দি সিনেমায় গ্ল্যামারের সংজ্ঞায় পরিবর্তন আসে। তিনি ছিলেন ভারতীয় চলচ্চিত্রের প্রথম 'অ্যান্টি-হিরো'। তাঁর ক্যারিয়ারের প্রথম হিট ছবি ছিল 'অচ্ছুত কন্যা'। তবে বাণিজ্যিক সাফল্যের চূড়ায় তিনি পৌঁছান 'কিসমত' ছবির মাধ্যমে। এটিই ছিল বলিউডের প্রথম ছবি যা এক কোটি টাকার বেশি ব্যবসা করে 'ব্লকবাস্টার' তকমা পায়। তাঁর অভিনীত অন্যান্য উল্লেখযোগ্য ছবির তালিকায় রয়েছে 'শিকারি', 'মহল', 'মশাল', 'সংগ্রাম' এবং 'সাজন'।

পেশাগত জীবনের বাইরেও অশোক কুমারের বহুমুখী আগ্রহ ছিল। তিনি ছবি আঁকতেন, মঞ্চে অভিনয় করতেন এবং হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার চর্চাও করতেন। পারিবারিক জীবনে তিনি ছিলেন বড় ভাই, যার ছোট ভাই কিশোর কুমার হয়ে উঠেছিলেন বিখ্যাত গায়ক ও অভিনেতা। তবে ১৯৮৭ সালে কিশোর কুমারের প্রয়াণের পর থেকে তিনি আর কখনো নিজের জন্মদিন পালন করেননি।

সারা জীবন চলচ্চিত্রের সেবা করা এই শিল্পী ভারত সরকারের 'পদ্মশ্রী' ও 'পদ্মভূষণ' সহ দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার ও অসংখ্য জাতীয় পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। প্রায় ২৭৫টির বেশি চলচ্চিত্রে অভিনয় করা এই কিংবদন্তি ২০০১ সালের ১০ ডিসেম্বর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুতে কেবল বলিউড নয়, বরং পুরো ভারতীয় সংস্কৃতি এক অপূরণীয় ক্ষতি মেনে নেয়।