বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়—এই তিন স্তরেই শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়ছে, যার ফলে অনেকে জীবনের সঠিক পথ হারিয়ে ফেলছে। একজন প্রবাসী গবেষক তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এবং বিভিন্ন দেশের শিক্ষাব্যবস্থার তুলনামূলক বিশ্লেষণের মাধ্যমে এই সংকটের চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন। তাঁর মতে, শিক্ষার্থীদের এই বিপথগমন সামগ্রিকভাবে জাতীয় অগ্রগতির জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তাই শিক্ষক, অভিভাবক এবং সচেতন নাগরিক হিসেবে শিক্ষার্থীদের সঠিক দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে অবহিত করে তাঁদের পড়াশোনার টেবিলে ফিরিয়ে আনা এখন সময়ের দাবি।

শিক্ষার্থীদের সফলতার পথে প্রধান বাধা হিসেবে তিনি বেশ কিছু কারণ চিহ্নিত করেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো যোগ্য শিক্ষকের অভাব, শিক্ষাঙ্গনে রাজনীতির প্রভাব, অভিভাবকদের উদাসীনতা, প্রেরণা বা মোটিভেশনের ঘাটতি এবং স্মার্টফোন ও ফেসবুকের মতো সোশ্যাল মিডিয়ার প্রতি আসক্তি। এছাড়া কৈশোরের শারীরিক পরিবর্তন, অসৎ সঙ্গ, মাদকাসক্তি এবং পারিবারিক আর্থিক অভাব শিক্ষার্থীদের অগ্রযাত্রাকে মন্থর করে দিচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ার সমালোচনা করে তিনি জানান, ২০২৬ সালে এসেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো শীর্ষ প্রতিষ্ঠানে মাস্টার্স পাস করা শিক্ষার্থীদের নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, যা উন্নত বিশ্বের তুলনায় অত্যন্ত হতাশাজনক। প্রতিবেশী দেশগুলোতে পিএইচডি এবং গবেষণার অভিজ্ঞতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। তিনি অভিযোগ করেন, অনেক শিক্ষক উচ্চশিক্ষার সুযোগ নিয়ে বিদেশে চলে যান এবং আর ফিরে আসেন না, যার ফলে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ক্ষতি হয়। এছাড়া শিক্ষকদের মূল ধারার রাজনীতিতে সম্পৃক্ততার কারণে গবেষণার মান এবং শিক্ষার্থীদের প্রতি মনোযোগ হ্রাস পেয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। তাঁর মতে, উন্নত বিশ্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল লক্ষ্য থাকে জ্ঞানচর্চা ও গবেষণা, সেখানে রাজনৈতিক দলের অঙ্গসংগঠন বা ক্ষমতার চর্চার সুযোগ নেই।

পারিবারিক পর্যায় আলোচনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, অনেক সফল অভিভাবক সন্তানদের পর্যাপ্ত সময় দেন না বা তাঁদের জ্ঞান-বিজ্ঞানে উৎসাহিত করেন না। আবার অসচ্ছল অভিভাবকদের ক্ষেত্রে সুযোগের অভাব রয়েছে। এর ফলে শিক্ষার্থীরা কিশোর গ্যাং, ইভটিজিং বা ছিনতাইয়ের মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। বর্তমান সময়ে স্মার্টফোন, টিকটক এবং অনলাইন রিলস শিক্ষার্থীদের মধ্যে মাদকাসক্তির মতো এক ধরণের আসক্তি তৈরি করেছে, যা তাঁদের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দিচ্ছে। পাশাপাশি এইচএসসি পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের হরমোনজনিত শারীরিক পরিবর্তন এবং বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণের কারণে পড়াশোনায় মনোযোগ বিঘ্নিত হওয়ার বাস্তবতার কথা উল্লেখ করেন তিনি।

তবে আশার কথা শুনিয়ে তিনি বলেন, সঠিক কাউন্সেলিং এবং মোটিভেশনের মাধ্যমে ছন্দপতন হওয়া শিক্ষার্থীদের আবারও মূল ধারায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব। বন্ধু নির্বাচনের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা এবং অভিভাবকদের সচেতন হওয়া অত্যন্ত জরুরি। আর্থিক অভাব থাকলেও সঠিক পরিকল্পনা ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে সফল হওয়া সম্ভব।

নিজের জীবনের গল্প শুনিয়ে এই লেখক জানান, তিনি প্রত্যন্ত এক গ্রামের বিদ্যুৎহীন পরিবেশে প্রাথমিক শিক্ষা শুরু করেছিলেন। পরবর্তীতে উচ্চশিক্ষা এবং দীর্ঘ প্রচেষ্টায় তিনি জাপান, কানাডা ও আমেরিকার নামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নে পিএইচডি ও পোস্টডক সম্পন্ন করেন। উন্নত বিশ্বের শিক্ষা ও সংস্কৃতির সাথে বাংলাদেশের ব্যবধান উপলব্ধি করে তিনি এখন ছুটিতে দেশে এসে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করেন। নিজের জীবনের ব্যর্থতা ও সফলতার অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে তিনি শিক্ষার্থীদের সেমিনার এবং মোটিভেশনাল স্পিচের মাধ্যমে দিকনির্দেশনা প্রদান করে যাচ্ছেন, যাতে নতুন প্রজন্ম আরও সমৃদ্ধ হতে পারে।