বাংলাদেশে জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়ানো বিষাক্ত বালাইনাশক প্যারাকোয়াট গ্রুপের আমদানি, নতুন নিবন্ধন এবং লাইসেন্স নবায়ন সম্পূর্ণ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বালাইনাশক কারিগরি উপদেষ্টা কমিটি (পিটাক)। গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত পিটাকের ৯১তম সভায় সর্বসম্মতিক্রমে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভার কার্যবিবরণী অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে এই বালাইনাশকের মোট মজুত ৩৯৫ মেট্রিক টন, যা আগামী ছয় মাসের মধ্যে পুরোপুরি শেষ করতে হবে।
প্যারাকোয়াট নিষিদ্ধের এই পদক্ষেপের পেছনে মূল কারণ এর তীব্র বিষাক্ততা এবং দেশে এর অপব্যবহারের ফলে ক্রমবর্ধমান মৃত্যুর হার। গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১৩ সালে যেখানে প্যারাকোয়াট পানে মৃত্যুর রেকর্ড ছিল মাত্র একটি, ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১২ জনে। এই রাসায়নিকের কোনো প্রতিষেধক নেই এবং এটি ত্বক বা শ্বাসনালির মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে ফুসফুস ও কিডনির মারাত্মক ক্ষতি করে, যা অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুর কারণ হয়। বিশ্বের ৭৭টিরও বেশি দেশে ইতিমধ্যে এটি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্যমতে, ২০১৩ সালে ৫৩ টন প্যারাকোয়াট আমদানি করা হলেও ২০২৩ সালে তা ৪ হাজার ৬৯৫ টনে উন্নীত হয়েছিল। মূলত শ্রমিকের সংকট ও মজুরি বৃদ্ধির কারণে কৃষকরা আগাছা পরিষ্কারে এই রাসায়নিকের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
পিটাকের সভাপতি ও বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের নির্বাহী চেয়ারম্যান মো. আবদুছ ছালাম জানান, জাতীয় জীববৈচিত্র্য কর্মপরিকল্পনা ২০৩০-এর অংশ হিসেবে বিপজ্জনক বালাইনাশক ধাপে ধাপে কমানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এই পরিকল্পনারই অংশ হিসেবে প্যারাকোয়াট নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসক ফজলে রাব্বি চৌধুরী এই সিদ্ধান্তকে জনস্বাস্থ্যের জন্য ইতিবাচক বলে অভিহিত করেছেন। পাশাপাশি বাংলাদেশ অ্যাগ্রোকেমিক্যাল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কে এস এম মোস্তাফিজুর রহমান বিষমুক্ত খাদ্য নিশ্চিত করতে এবং রপ্তানি বৃদ্ধিতে এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন।
অন্যদিকে, ক্ষতিকর বালাইনাশক গ্লাইফোসেট নিয়েও সভায় আলোচনা হলেও তা নিষিদ্ধ করার কোনো সুনির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারিত হয়নি। আগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এর মজুত শূন্য করার কথা থাকলেও প্যারাকোয়াটের মতো কঠোর সময়সীমা দেওয়া হয়নি। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্ভিদ সংরক্ষণ উইংয়ের পরিচালক নাহিদা আমীন জানান, গ্লাইফোসেটের বর্তমান মজুত সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
গ্লাইফোসেটের ঝুঁকি নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দীর্ঘ বিতর্ক রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আন্তর্জাতিক ক্যানসার গবেষণা সংস্থা ২০১৫ সালে একে 'গ্রুপ ২এ' বা সম্ভাব্য ক্যানসার সৃষ্টিকারী হিসেবে চিহ্নিত করে। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ২০২৩ সালে এর অনুমোদন ২০৩৩ সাল পর্যন্ত নবায়ন করেছে, যদিও সেখানে কিছু শর্ত রাখা হয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনীর দ্বারা গ্লাইফোসেট ছিটানোর অভিযোগ এবং শ্রীলঙ্কায় কিডনি রোগের সাথে এর জটিল যৌগের সম্পর্কের বিষয়ে গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গোপাল দাস সতর্ক করেছেন যে, গ্লাইফোসেট মাটি ও পানির ভারী ধাতুর সাথে মিশে খাদ্যচেইনের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে জটিল রোগ তৈরি করতে পারে।




