বাগেরহাটের মোংলা উপজেলায় এক ব্যক্তিকে জোরপূর্বক গুমের অভিযোগ উঠেছে কোস্টগার্ডের বিরুদ্ধে। ঘটনাটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে তদন্তের দাবি জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। সংগঠনটি নিজস্ব প্রাথমিক তথ্যানুসন্ধান চালিয়ে এই আহ্বান জানিয়েছে। এরই মধ্যে নিখোঁজ মিরাজ শেখকে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এই নির্দেশ আসে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচও এ ঘটনার তদন্তে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। জুলাই অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে প্রথম গুমের অভিযোগ নিয়ে এই তদন্তের দাবি জানিয়েছে তারা।
মিরাজ শেখ (৩০) পেশায় মোটরসাইকেল চালক এবং সুন্দরবনে মাছ ধরার কাজও করতেন। গত ৩০ এপ্রিল কোস্টগার্ড সদস্য পরিচয়ে কয়েকজন ব্যক্তি তাকে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর থেকে তিনি নিখোঁজ রয়েছেন। আসক গত ১৬ ও ১৭ মে দুই দিনব্যাপী সরেজমিনে তথ্যানুসন্ধান চালায়। এ সময় মিরাজের পরিবারের সদস্য, স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী, সাংবাদিক, পুলিশ ও কোস্টগার্ড কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেন সংগঠনের প্রতিনিধিরা।
প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে আসক জানিয়েছে, গত ১০ এপ্রিল সন্ধ্যা আনুমানিক ৭টার দিকে সাদাপোশাকে কোস্টগার্ড সদস্য পরিচয়ধারী কয়েকজন ব্যক্তি জয়মনির ঘোল এলাকায় আল আমিনের চায়ের দোকানের সামনে থেকে মিরাজকে জোরপূর্বক ধরে নিয়ে যান। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, তাকে পরে কোস্টগার্ডের একটি স্পিডবোটে তোলা হয়, যেখানে পোশাক পরিহিত আরও সাত-আটজন কোস্টগার্ড সদস্য অবস্থান করছিলেন। মিরাজের স্ত্রী দাবি করেছেন, তিনি হারবারিয়া কোস্টগার্ড স্টেশনের পন্টুনে নিজের চোখে স্বামীকে কোস্টগার্ড সদস্যদের হেফাজতে দেখতে পান এবং পরে তাকে স্পিডবোটে করে নিয়ে যেতে দেখেন।
মিরাজের স্ত্রী আরও জানান, ঘটনার রাতে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য মো. নাজমুলের মাধ্যমে কোস্টগার্ড স্টেশনের ইনচার্জের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তখন বলা হয়, জিজ্ঞাসাবাদের জন্য মিরাজকে নেওয়া হয়েছে এবং জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাকে ছেড়ে দেওয়া হবে। পরদিন সকালে পরিবারের সদস্যরা দিগরাজ কোস্টগার্ড অফিসে গেলে প্রথমে তাকে ধরে নেওয়ার কথা অস্বীকার করা হয়। পরে দায়িত্বরত একজন সদস্য জানান, মিরাজকে নিয়ে অভিযানে যাওয়া হয়েছে এবং বিকেলে এলে দেখা করা যেতে পারে।
আসকের প্রতিনিধিরা আরও জানতে পারেন, মিরাজকে তুলে নেওয়ার সময় তার মোটরসাইকেলটি স্থানীয় চায়ের দোকানদার মো. আল আমিনের জিম্মায় রাখা হয়। ঘটনার আট থেকে দশ দিন পর গভীর রাতে কোস্টগার্ড সদস্য পরিচয়ে মুখোশধারী দুই ব্যক্তি এসে মোটরসাইকেলটি নিয়ে যায়। আসকের দল দিগরাজ কোস্টগার্ড বেজে গিয়ে লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মাহবুব হোসেনের সঙ্গেও দেখা করে। তিনি মিরাজকে আটক বা তুলে নেওয়ার অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন। এমনকি পরিবারের সদস্যরা দিগরাজ বেজে গিয়েছিলেন বলেও অস্বীকার করেন। তিনি আসককে বলেন, জয়মনির ঘোল এলাকা পূর্বে দুষ্কৃতকারীদের ঘাঁটি ছিল এবং সেখানে কোস্টগার্ডের কার্যক্রমে অবৈধ কর্মকাণ্ড বন্ধ হয়ে যাওয়ায় একটি স্বার্থান্বেষী মহল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এই অভিযোগ তুলেছে।
মিরাজের পরিবারের অভিযোগ, ১০ এপ্রিলের ঘটনার পর একাধিকবার থানায় গেলেও সাধারণ ডায়েরি গ্রহণে অনীহা প্রকাশ করে পুলিশ। পরে ২৩ এপ্রিল কোস্টগার্ডের নাম উল্লেখ না করে একটি জিডি নথিভুক্ত করা হয়। পরিবারের দাবি, থানার নির্দেশনা অনুযায়ী জিডিতে উল্লেখ করা হয় মিরাজ নিজ বাড়ি থেকে নিখোঁজ হয়েছেন এবং কোস্টগার্ড কর্তৃক তাকে তুলে নেওয়ার অভিযোগ সেখানে অন্তর্ভুক্ত করতে দেওয়া হয়নি।
তথ্যানুসন্ধানের পর আসক মনে করছে, প্রাপ্ত তথ্য, ভুক্তভোগীর পরিবার ও একাধিক প্রত্যক্ষদর্শীর ধারাবাহিক বক্তব্য এবং কোস্টগার্ডের আনুষ্ঠানিক অস্বীকৃতির মধ্যে স্পষ্ট অসংগতি একটি গুরুতর মানবাধিকার উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। সংগঠনের প্রতিবেদনে বলা হয়, কোনো ব্যক্তিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে নেওয়ার পর তার অবস্থান অস্বীকার করা, পরিবারকে অবহিত না করা বা আইনানুগ সময়ের মধ্যে আদালতে উপস্থাপন না করা বাংলাদেশের সংবিধানে নিশ্চিত জীবন, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও ন্যায্য আইনি প্রক্রিয়ার অধিকারের পরিপন্থী। এটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও জোরপূর্বক গুম-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গেও অসামঞ্জস্যপূর্ণ। রাষ্ট্রের কোনো বাহিনীর বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ শুধু একটি পরিবারের ন্যায়বিচারের প্রশ্ন নয়, বরং আইনের শাসন, জবাবদিহি ও জন-আস্থার সঙ্গেও প্রত্যক্ষভাবে সম্পর্কিত। তাই আসক অবিলম্বে মিরাজের অবস্থান নির্ণয়, পরিবারের কাছে প্রকৃত তথ্য প্রকাশ, বিচার বিভাগীয় তদন্ত এবং দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে।




