জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালানোর অভিযোগে পুলিশের ১ হাজার ৪৯০ সদস্যের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৬৮ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন এবং ৫৭ জন পলাতক রয়েছেন। মামলার বাইরেও বিভিন্ন পদমর্যাদার ১৪১ জন পুলিশ সদস্যকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। ওএসডি ও বিভিন্ন ইউনিটে সংযুক্ত করা হয়েছে আরও ১৪২ জনকে। পলায়নের অভিযোগে সাময়িক বরখাস্ত হয়েছেন ৯৩ জন।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গণ-অভ্যুত্থানের পর সারা দেশে ১৩৭ জন পুলিশ সদস্য কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন। পর্যায়ক্রমে তাঁদের মধ্যে ৮০ জন কর্মস্থলে ফিরে এলেও ৫৭ জন এখনো পলাতক। পলাতকদের মধ্যে ডিআইজি, অতিরিক্ত ডিআইজি, পুলিশ সুপার, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, এএসপি, পরিদর্শক, এসআই, এএসআই ও কনস্টেবল পদমর্যাদার কর্মকর্তারা রয়েছেন।

শাস্তির আওতায় আসা পুলিশ সদস্যদের একটি অংশের অভিযোগ, প্রকৃত সম্পৃক্ততা যাচাই না করেই অনেক কর্মকর্তাকে মামলায় আসামি করা হয়েছে। তাঁদের দাবি, কেউ ঘটনাস্থলেই ছিলেন না, কারও ডিউটি রোস্টারে নাম ছিল না, আবার কেউ তখন অন্য ইউনিটে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তবুও তাঁদের মামলার আসামি হতে হয়েছে। পুলিশের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণেও কেউ কেউ মামলায় জড়িয়েছেন বলে তাঁরা মনে করেন। এতে প্রকৃত অপরাধীদের পাশাপাশি নির্দোষ কর্মকর্তারাও শাস্তির মুখে পড়ছেন।

জুলাই অভ্যুত্থানের সময় ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের উপকমিশনারের দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত ডিআইজি মশিউর রহমানসহ চারজন উপকমিশনার এবং সিটিটিসি ও অ্যান্টিটেররিজম ইউনিটের পুলিশ সুপার পদমর্যাদার তিন কর্মকর্তার নাম ডিউটি রোস্টারে ছিল না বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দাবি করেছেন। তাঁদের ভাষ্য, এরপরও এসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে একাধিক হত্যা মামলা হয়েছে। মশিউর রহমানসহ দুজন বর্তমানে কারাগারে, দুজন রেঞ্জ ডিআইজির কার্যালয়ে সংযুক্ত, একজন পলাতক এবং আরেকজন একটি ইউনিটে কর্মরত।

বাধ্যতামূলক অবসরের তালিকায় থাকা কিছু কর্মকর্তার সহকর্মীদের দাবি, তাঁদের কেউ কেউ দীর্ঘ কর্মজীবনে জেলা পুলিশ সুপার বা পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেননি। তাঁদের মধ্যে ডিআইজি কাজী জিয়া উদ্দিন, ডিআইজি আবদুল্লাহিল বাকি ও অতিরিক্ত ডিআইজি রেবেকা সুলতানার নাম উল্লেখ করেছেন সহকর্মীরা। তাঁদের মতে, পেশাদার কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত এসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে জুলাই অভ্যুত্থানে সরাসরি ভূমিকার অভিযোগ নেই। প্রতিদ্বন্দ্বী কর্মকর্তাদের প্রভাব বা অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণেই তাঁরা শাস্তির মুখে হয়েছেন।

বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) প্রধান ও অতিরিক্ত আইজিপি মোহাম্মদ আলী মিয়ার বিরুদ্ধে হত্যাসহ আটটি মামলা রয়েছে। জুলাই অভ্যুত্থানে রংপুরে শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যা মামলায় ১০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত রংপুর মহানগর পুলিশের সাবেক কমিশনার মো. মনিরুজ্জামানকেও বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে আরও ছয়টি ফৌজদারি মামলা রয়েছে। অভিযোগ ও মামলা থাকা সত্ত্বেও মোহাম্মদ আলী মিয়া ও মনিরুজ্জামানের মতো প্রভাবশালী অনেক পুলিশ কর্মকর্তাকে এখনো গ্রেপ্তার করা যায়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর।

কারা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে থাকা পুলিশের ৬৮ সাবেক কর্মকর্তাদের মধ্যে আছেন—সাবেক আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক, ডিএমপির সাবেক কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া, সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি ইকবাল বাহার, গাজীপুর মহানগর পুলিশের সাবেক কমিশনার মোল্যা নজরুল ইসলাম ও চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের সাবেক কমিশনার মো. সাইফুল ইসলাম।

মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় পুলিশের কয়েকজন সাবেক কর্মকর্তাও দণ্ডিত হয়েছেন। সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন দুটি মামলায় রাজসাক্ষী বা অ্যাপ্রুভার হয়েছিলেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাঁকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন। আশুলিয়ায় ছয়জনের লাশ পোড়ানোসহ সাতজন হত্যার মামলায় সাবেক এসআই আবদুল মালেক ও সাবেক কনস্টেবল মুকুল চোকদারকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই মামলায় সাবেক পুলিশ সুপার আবদুল্লাহিল কাফীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।

পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম জানান, পলাতক পুলিশ সদস্যদের মধ্যে যাঁদের চাকরির বয়স ২৫ বছরের কম, তাঁদের বিভাগীয় মামলার মাধ্যমে চাকরি থেকে বরখাস্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। আর যাঁদের চাকরির বয়স ২৫ বছরের বেশি, তাঁদের সরাসরি বরখাস্ত করা হবে। যেসব মামলায় পুলিশ সদস্যদের কারাদণ্ড হয়েছে, তাঁদের নামে রেড নোটিশ জারির বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন।

এদিকে পুলিশের সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তাদের কেউ কেউ মনে করছেন, অতীতে ক্ষমতার অপব্যবহার, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও আন্দোলন দমনে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগে জড়িত কর্মকর্তাদের বিচার হওয়া জরুরি। তবে তাঁদের ক্ষেত্রেও যথাযথ তদন্ত ও প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন তাঁরা। সাবেক আইজিপি মো. আবদুল কাইয়ুম বলেছেন, যাঁরা আইন ভেঙে জুলুম-নির্যাতন, খুন ও হত্যা করে অপরাধ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছেন, তাঁদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। তবে যথাযথ অনুসন্ধানের পর তথ্য সংগ্রহ করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে, যেন একজন নির্দোষ লোকও শাস্তির আওতায় না আসে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, মামলা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার কারণে বাহিনীর বাইরে চলে যাচ্ছে অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশ। এতে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কর্মকর্তার সংকট তৈরি হচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের ওপর। এভাবে চলতে থাকলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা পুলিশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে বলে মনে করছেন তাঁরা।