দেশের শিল্পকারখানা গত দুই সপ্তাহ ধরে ভয়াবহ গ্যাস সংকটের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে উৎপাদন কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে এবং অনেক প্রতিষ্ঠান বাড়তি ছুটি ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছে। সোমবার (৪ আগস্ট) বিভিন্ন কারখানা ও ব্যবসায়ী সংগঠনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সামগ্রিকভাবে উৎপাদন কমেছে প্রায় ৪০ শতাংশ।
গাজীপুরের কোনাবাড়ীতে অবস্থিত মিতালি ফ্যাশনের ডাইং সেকশনটি গ্যাসের অভাবে গত আট দিন ধরে বন্ধ রয়েছে। এই কারণে প্রতিষ্ঠানটির সেলাই বিভাগের ৩০টি উৎপাদন লাইনের মধ্যে ১৮টিই অকার্যকর হয়ে পড়েছে। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান আবু ইউসুফ আবদুল্লাহ জানিয়েছেন, সংকটের কারণে উৎপাদন সচল রাখা দুরূহ হয়ে পড়েছে এবং কিছু রপ্তানি আদেশ সময়মতো পূরণ করা সম্ভব হবে না, যার ফলে ক্রেতাদের মূল্যছাড় দিতে হতে পারে।
রাজধানীর তেজগাঁও শিল্প এলাকায় কোহিনূর কেমিক্যাল তাদের কারখানায় সকাল ছয়টা থেকে দুই শিফটে ১৬ ঘণ্টা উৎপাদন করত। বর্তমানে গ্যাস সংকটের কারণে দিনের বেলা উৎপাদন বন্ধ রেখে রাতে অল্প চাপে কাজ চালানো হচ্ছে। ফলে সাবান, ডিটারজেন্ট ও প্রসাধনীর উৎপাদন ২০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট গোলাম কিবরিয়া সরকার জানান, মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে কাঁচামালের আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির সাথে এখন গ্যাস সংকট যুক্ত হয়েছে, যার ফলে তারা লোকসান গুনছেন।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের হবিগঞ্জের শিল্পপার্কে উৎপাদন ৪০-৪৫ শতাংশে নেমে এসেছে। ক্যাপটিভ জেনারেটরে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রায় বন্ধ থাকায় পল্লী বিদ্যুতের ওপর নির্ভর করে কারখানা চলছে। প্রতিষ্ঠানটির বিপণন পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল জানান, উৎপাদন সক্ষমতার মাত্র ৬০ শতাংশ ব্যবহার করা যাচ্ছে এবং চাহিদা অনুযায়ী পণ্য সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না।
সাভারের লিটল স্টার স্পিনিং মিলসে প্রতিদিন ২৪ হাজার পাউন্ড সুতা উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও গতকাল উৎপাদন হয়েছে মাত্র ১০ হাজার পাউন্ড। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান খোরশেদ আলম জানান, অর্ধেক সক্ষমতায় কারখানা চালালে মাসে ৭০ লাখ থেকে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা লোকসান হতে পারে।
ডিবিএল গ্রুপের গাজীপুরের কারখানায় ডাইং সেকশনের উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ায় তারা ৫ আগস্টের সরকারি ছুটির সাথে আরও তিন দিন বাড়তি ছুটি ঘোষণা করেছে। গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান এম এ রহিম জানান, শ্রমিকদের অনুরোধে ছুটি আরও একদিন বাড়ানো হয়েছে এবং আশা করা হচ্ছে ছুটি শেষ হওয়ার আগেই গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বাড়বে।
কাচশিল্পের উদ্যোক্তারা সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন। পিএইচপি ফ্লোট গ্লাস ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমির হোসেন জানান, গ্যাসের চাপ ৭৫ পিএসআইতে নেমে এসেছে, যা আরও কমলে চুল্লি অকার্যকর হয়ে পড়বে। নতুন চুল্লি স্থাপনে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে বলে তিনি জানান।
চট্টগ্রামের কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় জাতীয় গ্রিড থেকে তারা মাত্র ১৯ কোটি ঘনফুট গ্যাস পেয়েছে, অথচ দৈনিক চাহিদা অন্তত ৩৫ কোটি ঘনফুট।
বিএসআরএম গ্রুপের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন সেনগুপ্ত জানান, গ্যাসের চাপ কখনো ২-৩ পিএসআই থেকে শূন্যে নেমে আসছে। বিকল্প হিসেবে ফার্নেস অয়েল বা ডিজেল ব্যবহার করা গেলেও তা এক-দুই দিনের বেশি সম্ভব নয়।
সিরামিকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিসিএমইএ তিতাস গ্যাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে চিঠি দিয়ে জানিয়েছে, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদী ও ময়মনসিংহের ২০টি সিরামিক কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, এলএনজি নির্ভরতা কমানো এবং জ্বালানি উৎসের বহুমুখীকরণের পাশাপাশি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে জোর দিতে হবে।
গত ২১ জুলাই কক্সবাজারের মহেশখালীতে একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল অগ্নিদুর্ঘটনার পর বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সংকট আরও প্রকট হয়েছে। বর্তমানে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ ২১৫ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছে, যেখানে চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট। পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, টার্মিনালটি আংশিক চালু হলে ৩০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ বাড়বে।
বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান জানান, পোশাক কারখানাগুলো মাত্র ৬০-৭০ শতাংশ উৎপাদন কার্যক্রম সচল রাখতে পারছে। সিএনজি ফিলিং স্টেশন থেকে সিলিন্ডার ভরে গ্যাস নেওয়ার সুযোগও এখন আর নেই বলে তিনি জানান।



