বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন গ্র্যান্ড স্ল্যাম টুর্নামেন্ট উইম্বলডনের পর্দার আড়ালে রয়েছে প্রযুক্তি জায়ান্ট আইবিএমের একটি গোপন ঘাঁটি, যার নাম দেওয়া হয়েছে 'কোর্ট ১৯'। আইবিএমের সহায়তায় ১৯৯১ সালে সর্বপ্রথম সার্ভ-স্পিড রাডার ব্যবহার করা হয়, যার মাধ্যমে বর্তমানে গিয়োভানি এমপেটশি পেরিকার্ডের রেকর্ড ১৫৩ মাইল প্রতি ঘণ্টার সার্ভের গতি তাৎক্ষণিকভাবে স্কোরবোর্ডে প্রদর্শিত হয়। এরপর ধারাবাহিকভাবে ১৯৯৫ সালে ওয়েবসাইট, ২০০৯ সালে অ্যাপ চালু এবং ২০১৭ সালে শুরু হয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) সংযোজন। চলতি বছর এই অংশীদারিত্ব ২০৩০ সাল পর্যন্ত নবায়ন করা হয়েছে, যার লক্ষ্য হলো বিশ্বজুড়ে আরও বেশি দর্শকের কাছে অর্থপূর্ণ উপায়ে টুর্নামেন্ট পৌঁছে দেওয়া।

উইম্বলডনের বিপণন ও বাণিজ্যিক পরিচালক উসামা আল-কাসাব বলছেন, নতুন ডিজিটাল রূপান্তর পরিকল্পনার মাধ্যমে আরও বেশি মানুষকে সম্পৃক্ত করা হবে। বর্তমানে টুর্নামেন্ট চলাকালীন প্রায় ১৮ বিলিয়ন ইম্প্রেশন সৃষ্টি হয়, যা প্রায় ৭৩ কোটি মানুষের কাছে পৌঁছায়। শুধুমাত্র বিগত এক বছরে অফিসিয়াল ওয়েবসাইট ও অ্যাপে ভিজিট ২০% বেড়েছে এবং মাইউইম্বলডনে রেজিস্ট্রেশন বেড়েছে ৩৯ শতাংশ। সারাবছরই অ্যাপটি টিকিটিং, প্লেয়ার সার্ভিস ও সদস্য বুকিংয়ে ব্যবহৃত হয়।

উইম্বলডনের ১৮ নম্বর গ্রাস কোর্টের নিচে অবস্থিত 'কোর্ট ১৯' নামক প্রযুক্তি হাবটিতে পুরো টুর্নামেন্ট জুড়ে ২.৭ মিলিয়ন ডেটা পয়েন্ট প্রক্রিয়াজাত করা হয়, যার মধ্যে বলের গতি, শট প্লেসমেন্ট ও মোমেন্টাম সুইংয়ের মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত। আইবিএমের গ্লোবাল স্পোর্টস অ্যান্ড এন্টারটেইনমেন্ট পার্টনারশিপের ভাইস প্রেসিডেন্ট ক্যামেরিন স্ট্যানহাউস জানান, নির্বাহীদের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে এক ধরনের ভীতি কাজ করছে। এটি এই কারণে নয় যে তারা প্রযুক্তি গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সন্দেহ পোষণ করে, বরং তারা জানে যে ভুল বাস্তবায়ন তাদের চাকরি পর্যন্ত শেষ করে দিতে পারে। স্ট্যানহাউসের মতে উইম্বলডনের মতো দৃশ্যমান ও উচ্চ-স্টেকের আয়োজন আইবিএমকে দায়িত্বশীল ও বিশ্বাসযোগ্য উপায়ে প্রযুক্তি প্রদর্শনের সুযোগ করে দেয়।

তবে এআই বাস্তবায়নের সঠিকতা নিয়ে ভীতি যে অমূলক নয়, তা প্রমাণিত হয়েছে সাম্প্রতিক কিছু ঘটনায়। ক্যাপজেমিনির ২০২৫ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে ৭০ শতাংশ ক্রীড়া অনুরাগী রিয়েল-টাইম ম্যাচ ডেটা চান, তবে অর্ধেকের বেশি মনে করেন অতিরিক্ত প্রযুক্তি খেলার স্বতঃস্ফূর্ততা নষ্ট করে দেয়। ২০২৫ সালে উইম্বলডনে ১৪৭ বছরের ঐতিহ্যবাহী লাইন জাজদের পরিবর্তে স্বয়ংক্রিয় ইলেকট্রনিক লাইন-কলিং সিস্টেম চালু করা হয়, যা সনি'র হক-আই প্রযুক্তি। শুরুতে সিস্টেমটি বিতর্কের মুখে পড়ে: একটি কোয়ার্টার ফাইনালে তিনটি ভুল কল দেয় এবং আরেক ঘটনায় মিড-র্যালিতে 'ফল্ট' বলে দেয়, যাতে আম্পায়ারকে হস্তক্ষেপ করতে হয়। ব্রিটিশ টেনিস তারকা জ্যাক ড্রেপার ও এমা রাদুকানু নির্ভুলতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন। আইবিএম অবশ্য জোর দিয়ে বলে যে তাদের নিজস্ব ফিচারগুলো 'হিউম্যান-লেড' এবং একটি গভর্নেন্স লেয়ারের মাধ্যমে আত্মবিশ্বাস স্কোর ও বায়াস চেক করা হয়।

অতীতের তুলনায় প্রযুক্তির ব্যবহারে কিছু আনুষ্ঠানিকতা হারিয়ে গেছে বলে অনেকে মনে করেন। পূর্বে প্লেয়াররা লাইন জাজের সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করতে পারতেন, যা নিয়ে দর্শকদের উত্তেজনা ও নীরবতা এক বিশেষ রীতি ছিল। স্ট্যানহাউস মনে করেন এই আপস সার্থক, কেননা অনুরাগীরা এখন প্রান্তিক কল নিয়ে কম তর্ক করে এবং বেশি আলোচনা করে প্রকৃত টেনিস ও পারফরম্যান্স নিয়ে।

আইবিএম তাদের 'বব' নামক ডেভেলপমেন্ট অ্যাক্সিলারেটর ব্যবহার করে উইম্বলডনের অ্যাপ ও ওয়েবসাইট পুনর্নির্মাণ করেছে, যার মাধ্যমে ১৫ হাজারের বেশি ডিজিটাল অ্যাসেট (নিবন্ধ, ছবি, ভিডিও ও তাদের মেটাডেটা) একটি নতুন প্ল্যাটফর্মে স্থানান্তর করা হয়েছে। সাধারণত পাঁচজন বিশেষজ্ঞের মাসব্যাপী কাজ একজন প্রকৌশলী এক মাসে সম্পন্ন করতে পারবেন বলে দাবি স্ট্যানহাউসের, এবং চূড়ান্ত স্থানান্তর সময় লেগেছে মাত্র ৪৭ মিনিট।

আইবিএম এখন হাইপার-পারসোনালাইজেশন ও রিমোট এক্সপেরিয়েন্সের দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। ইতোমধ্যে অ্যাপল ভিশন প্রো-র জন্য মাস্টার্স অ্যাপ তৈরি করা হয়েছে, যা গল্ফ অনুরাগীদের সম্পূর্ণ নিমজ্জিত পরিবেশে টুর্নামেন্ট দেখার সুযোগ দেয়। ভবিষ্যতে টেনিসেও এ ধরনের অভিজ্ঞতা আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের প্রয়োগ নিয়েও ভাবছে আইবিএম, যদিও এখনো ক্রীড়া ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট ব্যবহার খুঁজে পাওয়া যায়নি।

পরিশেষে স্ট্যানহাউস বলেন, প্রযুক্তি কখনো ক্রীড়ায় সম্পূর্ণ নির্ভুলতা আনতে পারবে না, কারণ মানুষের অনিশ্চয়তাই খেলাকে উত্তেজনাপূর্ণ করে রাখে। তবে উইম্বলডনের মতো মঞ্চ আইবিএমকে প্রমাণ করার সুযোগ দেয় যে তাদের প্রযুক্তি বাস্তব জগতের চাপ সহ্য করতে সক্ষম।