বুধবার ভোররাত ১২:০১ মিনিটের সময়সীমার আগে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করছে, যাতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুমকিকৃত ৫০ শতাংশ শুল্ক এড়ানো যায়। এই সময়সীমা অতিক্রম করলে হকি স্টিক থেকে শুরু করে জিভের ডিপ্রেসর পর্যন্ত প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের কানাডীয় পণ্যের ওপর ওই উচ্চহারের কর কার্যকর হতে পারে। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি সোমবার সাংবাদিকদের সঙ্গে ফরাসি ভাষায় কথা বলতে গিয়ে জানান, আলোচনা চলছে। তিনি বলেন, আলোচনা অত্যন্ত তীব্র ও সংবেদনশীল; এখন প্রকাশ্যে আলোচনা নিয়ে কথা বলার সময় নয়।
দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য নিয়ে দশকের পর দশক ধরে টানাপোড়েন চলছে। কানাডার নরম কাঠের আমদানি ও যুক্তরাষ্ট্রের দুগ্ধবাজারে প্রবেশাধিকার নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে। তবু তারা মিত্র, সহযোগী এবং বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে টিকে আছে। ৯/১১-এর পর আফগানিস্তানে কানাডিয়ান সৈন্যরা আমেরিকানদের পাশে লড়াই করেছে। ৫,৫২৫ মাইল দীর্ঘ যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা সীমান্ত অরক্ষিত; প্রতিদিন প্রায় ৩ লাখ ৩০ হাজার মানুষ এবং ২ বিলিয়ন ডলারের পণ্য এই সীমান্ত অতিক্রম করে। যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত কানাডিয়ানের সংখ্যা প্রায় ৮ লাখ। গত বছর কানাডার পণ্য রপ্তানির প্রায় ৭২ শতাংশই যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিল।
ট্রাম্পের কানাডার প্রতি উগ্র মনোভাব দুই দেশের ঐতিহ্যগত সহযোগিতামূলক সম্পর্ক থেকে এক নজিরবিহীন বিচ্যুতি। তিনি যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদন ফিরিয়ে আনতে কানাডীয় পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করেছেন এবং বারবার কানাডাকে আমেরিকার ৫১তম অঙ্গরাজ্য করার উসকানিমূলক মন্তব্য করেছেন। কানাডীয় জনগণের মধ্যে ক্ষোভ তীব্র হয়েছে। ২১ জুলাই থেকে ট্রাম্পের মিত্র ও যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত পিট হোয়েকস্ট্রাকে বহিষ্কারের দাবিতে একটি আবেদনপত্রে প্রায় ২ লাখ ১৮ হাজার স্বাক্ষর জমা পড়েছে। অভিযোগ, হোয়েকস্ট্রা কানাডাকে সংযুক্ত করার ট্রাম্পের বক্তব্যকে স্বাভাবিক করে তুলেছেন।
কিং অ্যান্ড স্পল্ডিংয়ের অংশীদার ও সাবেক মার্কিন বাণিজ্য কর্মকর্তা রায়ান মাজেরাস মনে করেন, কোনো পক্ষই এই শুল্ক কার্যকর হতে চায় না। নভেম্বরে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে নতুন একটি মোটা শুল্ক—যা যুক্তরাষ্ট্রের আমদানিকারকরা পরিশোধ করে ভোক্তাদের ওপর উচ্চমূল্যের মাধ্যমে চাপিয়ে দেয়—আরোপ করতে ট্রাম্প প্রশাসনও সতর্ক হতে পারে। আমেরিকান ভোটাররা ইতিমধ্যেই জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয়ে ক্ষুব্ধ। মাজেরাস বলেন, উভয় দিক থেকেই একটি সমঝোতার পথ খুঁজে বের করার জোরালো প্রচেষ্টা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র চাইছে কানাডা আরও মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম—বিশেষ করে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান—কিনুক; ট্রাম্পের গোল্ডেন ডোম ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা প্রকল্পে অংশ নিক; এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজের সরবরাহে যুক্তরাষ্ট্রকে আরও বেশি সুযোগ দিক, যাতে চীনের অনিশ্চিত সরবরাহের ওপর নির্ভরতা কমে। অন্যদিকে কানাডা চায় ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম এবং নরম কাঠের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক থেকে মুক্তি; ওয়াশিংটন দাবি করে, এই কাঠে অন্যায় সরকারি ভর্তুকি রয়েছে।
ট্রাম্প তার দ্বিতীয় মেয়াদে শুল্ককে অর্থনৈতিক এজেন্ডার কেন্দ্রবিন্দুতে রেখেছেন। গত বছর তিনি প্রায় প্রতিটি দেশের ওপর দ্বি-অঙ্কের আমদানি কর বসিয়েছিলেন, দীর্ঘদিনের বাণিজ্য ঘাটতিকে জাতীয় জরুরি অবস্থা হিসেবে ঘোষণা করে। ফেব্রুয়ারিতে সুপ্রিম কোর্ট রায় দেন যে, তিনি ক্ষমতার সীমা লঙ্ঘন করেছেন; ওই শুল্ক বাতিল করে আমদানিকারকদের ফেরত দেওয়ার পথ তৈরি হয়। এরপর ট্রাম্প শুল্কের প্রাচীর পুনর্গঠনে অন্য পথ খোঁজেন। গত মাসে তিনি ৫৯টি দেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের—যা যুক্তরাষ্ট্রের ৯৯ শতাংশ আমদানির উৎস—ওপর ১০ থেকে ১২.৫ শতাংশ কর বসান, অভিযোগ করে যে, তারা জোরপূর্বক শ্রমে তৈরি পণ্যের আমদানি সীমিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। এরপর তিনি কানাডাকে আঘাত করতে মহামন্দার যুগে ফিরে যান।
তিনি ১৯৩০ সালের শুল্ক আইনের ৩৩৮ ধারাকে ব্যবহার করেন—যা আগে কখনো প্রয়োগ হয়নি। প্রায় এক শতাব্দী আগে কংগ্রেস স্মুট-হলি শুল্ক নামে পরিচিত ওই আইন পাস করেছিল, যা বিশ্ব বাণিজ্য সীমিত করে মহামন্দাকে আরও খারাপ করেছিল বলে অর্থনীতিবিদ ও ইতিহাসবিদদের ধারণা। ৩৩৮ ধারা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসার প্রতি বৈষম্যকারী দেশের পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক বসানোর ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের রয়েছে। ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের ৩০১ ধারার মতো এতে কোনো তদন্তের প্রয়োজন নেই, আর সময়সীমাও নেই। ট্রাম্প দাবি করেন, কানাডা মার্কিন গাড়ি, অ্যালকোহল ও পনির রপ্তানির ক্ষেত্রে বৈষম্য করছে। গত বছর যখন তিনি তাদের পণ্যের ওপর কর বসিয়েছিলেন, তখন কানাডা ও চীনই ছিল একমাত্র দেশ যারা পাল্টা শুল্ক দিয়ে জবাব দিয়েছিল—এ কারণেই ট্রাম্প ক্ষুব্ধ।
আইওয়া স্টেট ফেয়ারে শুক্রবার মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার সাংবাদিকদের বলেন, কোনো দেশ যদি আমাদের বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নেয়, আমরা তা সহ্য করব না। আমরা ব্যবস্থা নেব। তিনি যোগ করেন, কানাডিয়ানরা আরও সমঝোতামূলক মনোভাব চাইছে বলে আমার ধারণা, তবে আমরা দেখব। ৩৩৮ ধারার শুল্কের হুমকি ওয়াশিংটনকে অটোয়া থেকে নতুন ছাড় আদায়ের সুযোগ করে দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে উত্তর আমেরিকার বাণিজ্য চুক্তি—ইউএসএমসিএ—পুনর্গঠনের আলোচনা করছে, যা ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে প্রতিবেশীদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছিলেন। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের ফেলো ক্রিস্টোফার গন্ডারম্যান বলেন, কার্নির দৃষ্টিকোণ থেকে ইউএসএমসিএ পুনর্গঠন প্রয়োজন; কিন্তু একটি বিশাল বাণিজ্য যুদ্ধ চলাকালীন তা সম্ভব নয়।
তবে কানাডার জনগণের ক্রোধ কার্নির সমঝোতার ক্ষমতাকে সীমিত করতে পারে। নতুন ৫০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হলে কানাডাও আবার পাল্টা ব্যবস্থা নিতে পারে, যা বাণিজ্য সংঘাতকে আরও তীব্র করবে। ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক বিজ্ঞান অধ্যাপক ড্যানিয়েল বেলাঁ বলেন, কানাডা সরকারকে ট্রাম্প প্রশাসনের দাবির কাছে কেবল আত্মসমর্পণ করছে বলে দেখানো যাবে না। তিনি ব্যাখ্যা করেন, অর্থপূর্ণ কিছু না পেয়ে আরও ছাড় দিলে তা তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে। এর ফলে কার্নি সরকারকে দুর্বল দেখানোর ঝুঁকি তৈরি হবে, যা ভবিষ্যতে আরও বাণিজ্যিক ও ভূরাজনৈতিক নির্যাতনের শিকার হতে পারে।
কানাডার বাণিজ্যমন্ত্রী ডমিনিক লেব্লাঙ্ক সোমবার গ্রিয়ারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সাক্ষাৎ শেষে তিনি সংক্ষিপ্ত মন্তব্য করেন, কাজ চলছে। আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছি। এই প্রতিবেদনটি প্রথমে ফরচুন ডটকমে প্রকাশিত হয় এবং টরন্টো থেকে গিলিস রিপোর্ট করেছেন।




