গণ-অভ্যুত্থানের পর গত এক বছরে বাংলাদেশের গণমাধ্যম পরিস্থিতিতে প্রত্যাশিত অগ্রগতি না ঘটায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশ্লেষক ও বিশেষজ্ঞরা। বুধবার রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে কমিউনিকেশন অ্যান্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশন (সিআরএফ) আয়োজিত এক সংলাপে ‘জুলাই পরবর্তী বাংলাদেশ: রাষ্ট্র ও গণতন্ত্র পুনর্গঠনে গণমাধ্যমের ভূমিকা’ শীর্ষক আলোচনায় তারা এসব পর্যবেক্ষণ দেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক গীতি আরা নাসরীন বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর গণমাধ্যমের সামগ্রিক অবস্থার উত্তরণ দেখা যায়নি। বরং পাঠক, দর্শক ও শ্রোতাদের কাছে গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা কমে গেছে। ফলে গণমাধ্যম তাদের গুরুত্ব হারিয়ে ফেলছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গঠিত সংস্কার কমিশন স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন প্রতিষ্ঠা এবং সাংবাদিক নিরাপত্তার জন্য যে বিশেষ সুপারিশ করেছিল, তা উপেক্ষা করা হয়েছে বলেও জানান অধ্যাপক নাসরীন। তিনি বলেন, ‘এখনো সাংবাদিককে আক্রমণ করা যায়, সংবাদপত্রের কার্যালয় পুড়িয়ে দেওয়া যায়। এ অবস্থা থেকে উত্তরণ জরুরি।’ তার মতে, জুলাই অভ্যুত্থানে রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় মৌলিক পরিবর্তন না আসায় একে প্রকৃত বিপ্লব বলা যায় না।

গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সদস্য জিমি আমির সংলাপে বলেন, কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে আমলাতন্ত্রই মূল বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তথ্য মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা সীমিত হওয়ার আশঙ্কা থেকে সুপারিশগুলো বাস্তবায়িত হচ্ছে না বলে তিনি অভিযোগ করেন। কমিশনের জনমত জরিপের তথ্য ওয়েবসাইট থেকে সরিয়ে নেওয়ার ঘটনাও তিনি প্রশ্নবিদ্ধ করেন। তার মতে, এই সুপারিশ বাস্তবায়িত হলে তথ্য মন্ত্রণালয়ের ক্ষমতা কমে যেতে পারে, তাই সেখান থেকে বাধা আসছে।

বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য মাহমুদা হাবিবা বর্তমান সময়ে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ায় গণমাধ্যমকে সবচেয়ে নাজুক অবস্থানে দেখছেন। তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্র, নাগরিক ও গণমাধ্যমের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা না থাকলে গণতান্ত্রিক সংস্কার টেকসই হবে না।’ অনেক সাংবাদিক এখনো অনিশ্চিত চাকরি ও অপ্রতুল বেতনে কাজ করছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি। মালিকপক্ষের অযৌক্তিক চাপ মোকাবিলায় আইনি সুরক্ষা ও পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিতের ওপর জোর দেন মাহমুদা হাবিবা।

প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান মোমেন জুলাই সনদ বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়নে অনিশ্চয়তা বা বিলম্ব কেবল রাজনৈতিক সংকটই তৈরি করবে না, বর্তমান রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন উঠবে।’

সাংবাদিক মাকসুদ-উন-নবী তাঁর বক্তব্যে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্য নিয়ে প্রশ্ন না তুলে তথ্যভিত্তিক ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার মাধ্যমে সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষার ওপর গুরুত্ব দেন। তার মতে, বিভাজন নয় বরং দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার মাধ্যমেই গণমাধ্যম তার ভূমিকা পালন করতে পারে।