২০২৪ সালের ৫ আগস্ট, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় শহীদ হওয়া দশম শ্রেণির মেধাবী ছাত্র সাফওয়ান আখতার সদ্যর দুই বছর পূর্ণ হয়েছে। তার মা খাদিজা বিন জুবায়েদ এই উপলক্ষে এক আবেগঘন স্মৃতিচারণমূলক লেখায় ফুটিয়ে তুলেছেন পুত্রশোকে জর্জরিত এক মায়ের অন্তরের বেদনা। তিনি লিখেছেন, দিন ও মাস পেরিয়ে গেলেও সদ্যর সেই ‘মা’ ডাকটি আর কানে আসে না। ছেলের প্রথম ডাকের সরলতা ও কোমলতা আজ শুধু স্মৃতির পাতায় ধোঁয়াটে হয়ে আছে। সন্তানের জন্মের পর তাকে প্রথম বুকের মাঝে চেপে ধরার সেই মুহূর্তটিও আজ কালোয় মিশে গেছে।

সদ্যর মা বলেন, তার ও স্বামীর পুরো পৃথিবীই ছিল ছেলেকে ঘিরে। ছেলের শৈশবের প্রতিটি মুহূর্ত, তাকে ঘুম পাড়ানো, খেলনা গোছানো, ভালোবাসায় ভিজিয়ে রাখা দিনগুলো কখনো ভোলার নয়। ছোট্ট হাতের টান, দুধের গন্ধমাখা শরীরের উষ্ণতা, সেই অবুঝ নির্ভরতায় ভরা ভালোবাসা—এই অনুভূতিগুলোর কোনো বিকল্প নেই। কারণ, সদ্য একবারই এসেছিল। এখন প্রতিদিন জানতে ইচ্ছে করে সে কেমন আছে, কিন্তু কান্না থাকে যা কোনো আর্তনাদ বা বিলাপ নয়, বরং বুকের ভেতর এক অসমাপ্ত ভার। দুই বছর ধরে তারা আত্মাহীন প্রেতের মতো বেঁচে আছেন; সময় যেন তাদের পূর্ণতা নয়, বরং অপূর্ণতার দিকে গুনছে।

শহীদ সদ্যর মা আরও লিখেছেন, আগে তিনি সব সময় ছেলেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন—পড়াশোনা, স্কুল, গৃহশিক্ষক, কী খাবে, কেমন করে ভবিষ্যৎ গড়বে—এসব নিয়েই তার প্রতিটি মুহূর্ত পূর্ণ ছিল। নিজের কোনো স্বাধীনতা ছিল না, শান্তির ঘুম হারিয়ে ফেলেছিলেন, নিজেকে সময় দিতে পারতেন না। নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন ছেলের স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ। কিন্তু এখন আর সকালে উঠে তার স্কুলব্যাগ গোছাতে হয় না, ড্রেস ইস্তিরি করতে হয় না, টিফিন বানাতে হয় না। শখ করে ঘড়ি, খেলনা বা জামাকাপড় কেনা হয় না। সন্ধ্যা হলেই আর ফুচকা বা চটপটির বায়না ধরে না সদ্য। তার জন্য আলাদা রান্না করা, সেই ছোট ছোট পেরেশানিও আর হয় না। তিনি বলেন, এখন আর ভুনা খিচুড়ি রান্না করেন না, কারণ ছেলে নেই, কেউ আর খেতে চায় না। বাবাকে দেখে কেউ আর দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরে না; তার চোখে সেই উচ্ছ্বসিত ভালোবাসা আর দেখা যায় না।

দুই হাতে ছেলেকে গোসল করিয়ে আদর করে মুছে দিয়ে বুকে চেপে ধরার সেই মুহূর্ত—সব আজ অতীত। ঘুমানোর আগে আর কেউ বারবার ‘গুড নাইট, মা’ বলে না। এই দুই বছর তাদের কাছে কেবল সময় নয়, যেন এক দীর্ঘশ্বাস হয়ে চারদিকে ঝুলে আছে। সদ্য একবার এসেছিল, তাদের জীবনে আলো জ্বালিয়েছিল, ভালোবাসার অর্থ শিখিয়েছিল, আর চিরতরে চলে গেল। সদ্য সাভার ক্যান্টেনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের দশম শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের একজন মেধাবী ছাত্র ছিল এবং তার ব্যবহার ও মায়াবী চেহারার কারণে সবার কাছে অত্যন্ত প্রিয় ছিল। খাদিজা বিন জুবায়েদ শেষে বলেন, লক্ষ্মীসোনা, তোমার রেখে যাওয়া আদর্শ ও স্বপ্নকে বুকে ধারণ করে দেশ ও দশের কল্যাণে কাজ করে যাব, ইনশা আল্লাহ।