যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরায়েলের সঙ্গে ওয়াশিংটনের ঐতিহাসিক মিত্রতা পুনর্বিবেচনার পথে হাঁটছেন বলে ইসরায়েলের রাজনৈতিক মহলে গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ১৯৪৮ সালে জায়নবাদী মিলিশিয়া থেকে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী গঠনের পর থেকেই দেশটিকে টিকিয়ে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে বর্তমানে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তাঁর রাজনৈতিক টিকে থাকার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ কৌশল অবলম্বন করছেন। দুর্নীতির মামলায় দোষী সাব্যস্ত হলে তাঁকে কারাগারে যেতে হতে পারে, অন্যদিকে বছরের শেষের দিকে অনুষ্ঠেয় সাধারণ নির্বাচনে তাঁর পরাজয়ের সম্ভাবনাও বেড়েছে।
ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি করার জন্য ওয়াশিংটনের চাপ এবং লেবাননে যুদ্ধবিরতির বিষয়টি—এ দুইয়ের মাঝে পড়ে নেতানিয়াহু তাঁর চার দশকের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছেন। সাম্প্রতিক জরিপে দেখা যাচ্ছে, শুধু সাধারণ মার্কিন জনগণই নয়, বরং ট্রাম্পের ডানপন্থী ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’ (এমএজিএ) আন্দোলনের কর্মীদের মধ্যেও ইসরায়েলের প্রতি তীব্র সংশয় তৈরি হয়েছে।
২০২৫ সালের জুনে ইরানের সঙ্গে ইসরায়েলের সংঘাতের পর নেতানিয়াহু আবার ইরানে হামলার চেষ্টা চালিয়েছিলেন। এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় মতবিরোধ আরও গভীর হয়েছে বলে জানা গেছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্ভাব্য শান্তিচুক্তির আলোচনায় তেহরান দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের যুদ্ধ বন্ধ করাকে প্রধান শর্ত হিসেবে উত্থাপন করায় দুই দেশের মধ্যে বড় ধরনের দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে। গত মাসে একটি ফোনকল ফাঁস হয়, যার সত্যতা হোয়াইট হাউস অস্বীকার করেনি। ওই আলাপচারিতায় ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ করতে মরিয়া ট্রাম্প লেবাননে হামলা বন্ধ করতে অস্বীকৃতি জানানোয় নেতানিয়াহুকে কড়া ভাষায় তিরস্কার করেন। ট্রাম্প তাঁকে ‘উন্মাদ’ বলে অভিহিত করেন এবং অকৃতজ্ঞতার অভিযোগ তোলেন। তিনি বলেন, ‘সবাই এখন আপনাকে ঘৃণা করে। আপনার কারণে সবাই ইসরায়েলকে ঘৃণা করছে।’
গত সপ্তাহে অ্যাক্সিওসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, নেতানিয়াহু ‘জানেন যে আসল বস কে’। এর মাধ্যমে দুই নেতার সম্পর্কের উত্তেজনা স্পষ্ট হয়ে যায়। জুনে এক সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ট্রাম্পকে ইসরায়েলের প্রতি সহানুভূতিশীল একমাত্র বিশ্বনেতা হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি ইসরায়েলি মন্ত্রীদের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনাদের দেশকে রক্ষায় প্রতিরক্ষামূলক অস্ত্রের দুই-তৃতীয়াংশই মার্কিনদের হাতে তৈরি এবং মার্কিন করদাতাদের অর্থে কেনা।’
এমএজিএ শিবিরেও ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন নিয়ে ফাটল দেখা দিয়েছে। প্রভাবশালী মিডিয়া ব্যক্তিত্ব মার্জোরি টেইলর গ্রিন ইসরায়েলের প্রতি মার্কিন সমর্থনের কড়া সমালোচনা করছেন। সাবেক টিভি উপস্থাপক টাকার কার্লসন তাঁর পডকাস্টে অভিযোগ তোলেন, ইসরায়েল ট্রাম্পকে ‘প্ররোচিত করে, হুমকি দিয়ে’ ইরানে হামলা করতে রাজি করিয়েছে, যাতে লেবাননের বিরুদ্ধে আরেকটি যুদ্ধ শুরু করা যায়। কার্লসন বলেন, ট্রাম্প বুঝতে পেরেছেন ইসরায়েলই তাঁর প্রশাসনের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি।
জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ও সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিআইসিএস) ড্যানিয়েল বাইম্যান আল-জাজিরাকে বলেন, ট্রাম্পের যথেষ্ট নমনীয়তা রয়েছে। তিনি দেখিয়েছেন, তিনি তাঁর দলের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশকে নিজের পক্ষে আনতে পারেন এবং এ ক্ষেত্রে অনেক ডেমোক্র্যাটও যোগ দেবেন, কারণ দলটির বড় অংশ ইসরায়েলের প্রতি সমালোচনামুখর।
ইসরায়েলের জন্য মার্কিন কূটনৈতিক ও সামরিক সমর্থনের গুরুত্ব অপরিসীম। একটি সমঝোতা স্মারকের আওতায় ২০১৬ সাল থেকে ইসরায়েল ১০ বছর মেয়াদে ৩ হাজার ৮০০ কোটি ডলার সামরিক সহায়তা পাচ্ছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে অন্য যেকোনো দেশের সঙ্গে সবচেয়ে বড় চুক্তি। গাজায় যুদ্ধের সময়ও ওয়াশিংটন কূটনৈতিক সমর্থন দিয়ে আসছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ইসরায়েলের হামলায় ৭৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের বেশির ভাগ নারী ও শিশু। জাতিসংঘে ইসরায়েলের পক্ষে ভেটো দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র অন্তত ছয়বার।
ইসরায়েলের সাধারণ নির্বাচনের প্রস্তুতির সময় নেতানিয়াহুর অনেক রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ফাটল ও আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতার বিষয়টি সামনে এনেছেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইয়ার লাপিদ এক্সে (সাবেক টুইটার) লেখেন, ‘আমরা দ্রুত এই সরকার পরিবর্তন না করলে ইসরায়েলের বৈদেশিক সম্পর্ক সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাবে।’ সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোট, যিনি নেতানিয়াহুর সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী, বলেন নেতানিয়াহুর ব্যর্থতাই ট্রাম্পকে একাকী এগিয়ে যেতে এবং ইরানের সঙ্গে চুক্তি করতে বাধ্য করেছে।
ইসরায়েলি রাজনৈতিক বিশ্লেষক নিম্রোদ ফ্ল্যাশেনবার্গ বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র আসলে সেই কবজা, যা বিশ্বে ইসরায়েলের অবস্থান নিশ্চিত করে। যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের জন্য সবকিছু—প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি, কূটনৈতিক মর্যাদা।’ মার্কিন লেখক ও সাবেক কূটনীতিক অ্যারন ডেভিড মিলার উল্লেখ করেন, ট্রাম্পই প্রথম মার্কিন প্রেসিডেন্ট নন যিনি ইসরায়েলের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়েছেন, তবে খুব কম সময়ই তা এত প্রকাশ্যে এসেছে। কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট বা ভাইস প্রেসিডেন্ট এভাবে ইসরায়েলি প্রতিপক্ষকে খাটো করার ভাষা ব্যবহার করেননি। তবে এত উত্তেজনা সত্ত্বেও ট্রাম্প প্রশাসন সম্পর্ক ছিন্ন করার কোনো ইঙ্গিত দিচ্ছে না। মিলার বলেন, ট্রাম্প যদি গুরুতর চাপ সৃষ্টি করতে চান, তবে তা হতে হবে বড় সাফল্যের আশায়। বর্তমানে লেবানন, গাজা বা ইসরায়েল-সৌদি সম্পর্ক স্বাভাবিককরণ—কোনো ইস্যুই সেই সাফল্যের কাছাকাছি নেই। তাই ইসরায়েলের ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ প্রয়োগের যৌক্তিকতা দেখা যাচ্ছে না।




