মঙ্গলবার নিজেদের প্রথম ত্রৈমাসিক আয়ের প্রতিবেদন প্রকাশের পর বুধবার স্পেসএক্সের শেয়ারের দর আবারও বড় পতনের মুখে পড়েছে। রকেট নির্মাতা এই কোম্পানির ত্রৈমাসিক ব্যয় ছয়গুণ বেড়ে যাওয়ার খবরে বিশ্লেষক ও বিনিয়োগকারীরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে। এলন মাস্কের নেতৃত্বাধীন প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারের দর বুধবার দুপুর নাগাদ ১৩% কমে প্রায় ১০৯ ডলারে নেমে এসেছে, যা সর্বনিম্ন দর ১০৪ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।

ফ্যাক্টসেটের তথ্য অনুযায়ী, স্পেসএক্স মঙ্গলবার ৭.৮১ বিলিয়ন ডলারের ত্রৈমাসিক আয় এবং শেয়ারপ্রতি ০.০৯ ডলার লোকসানের কথা জানিয়েছে। এই পরিসংখ্যান ওয়াল স্ট্রিটের পূর্বাভাসের চেয়ে ভালো ছিল—বিশ্লেষকরা আয় ৬.৯ বিলিয়ন ডলার এবং শেয়ারপ্রতি লোকসান ০.২৬ ডলার হওয়ার আশা করেছিলেন। কোম্পানির নিট লোকসানও আগের ১ বিলিয়ন ডলার থেকে কমে ৫৪১ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।

রকেট নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, তারা দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে মোট ১৮.৩ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে, যার মধ্যে ১৫.৮ বিলিয়ন ডলার গেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে। এই পরিমাণ ১৩.২ বিলিয়ন ডলারের পূর্বাভাসকেও ছাড়িয়ে গেছে। চলতি বছরের প্রথমার্ধে স্পেসএক্সের মূলধনী ব্যয় দাঁড়িয়েছে ২৮.৫ বিলিয়ন ডলারে—যা গত বছরের প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় ছয়গুণ বেশি।

আয়ের ঘোষণা পরবর্তী আলোচনায় এলন মাস্ক এবং স্পেসএক্সের প্রধান অর্থনৈতিক কর্মকর্তা ব্রেট জনসেন ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ কমাতে চেষ্টা করেছেন। জনসেন বলেন, সব মূলধনী ব্যয় এক রকম নয়, বিশেষ করে যখন এআইয়ের কথা আসে। এ প্রসঙ্গে মাস্ক শেয়ারহোল্ডারদের জানান, স্পেসএক্স শুধুমাত্র এনভিডিয়া চিপ ব্যবহার করে মহাকাশে এআই ডেটা সেন্টার নির্মাণের পরিকল্পনা করছে। মাস্ক আরও বলেন, কোম্পানি এখন ২০৩০ সালের মধ্যে—এবং সম্ভবত ২০২৯ সালের মধ্যেই—আয় ১ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার আশা করছে, যা তার আগের ২০৩১ সালের পূর্বাভাসের চেয়ে আগে।

বেশ কয়েকটি ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সের ত্রৈমাসিক আয় নিয়ে আশাবাদী বলে মনে হচ্ছে। জেপি মর্গানের বিশ্লেষকরা শেয়ারের লক্ষ্যমাত্রা ২২৫ ডলার থেকে বাড়িয়ে ২৪০ ডলার নির্ধারণ করেছেন। তারা লিখেছেন, স্পেসএক্স 'চরম উল্লম্ব একীকরণ' থেকে সুবিধা পাচ্ছে এবং এআইয়ের পরিবর্তনের গতি 'অবিশ্বাস্য দ্রুত'। তাদের মতে, এআই পরিকাঠামোতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং উচ্চতর নগদীকরণ ২০২৭ সালের মধ্যে স্পেসএক্সের এআই আয়কে ১০০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে দিতে পারে। অন্যদিকে, ওয়েলস ফারগোর বিশ্লেষকরা এআই ব্যয় নিয়ে বিস্তৃত সতর্কতার কারণে শেয়ারের লক্ষ্যমাত্রা ২৩০ ডলার থেকে কমিয়ে ২১৫ ডলার করেছেন। তারা উল্লেখ করেছেন, স্পেসএক্স 'উচ্চাকাঙ্ক্ষী সূচনা' করলেও ২০২৭ ও ২০২৮ সালের আয় পূর্বাভাস প্রত্যাশার চেয়ে বেশি ছিল এবং মূলধনী ব্যয়ের অনুমানও বেড়েছে। এক্সটিবি ব্রোকারেজের গবেষণা পরিচালক ক্যাথলিন ব্রুকস দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে বলেন, বিনিয়োগকারীদের জন্য উদ্বেগের বিষয় হলো ব্যয় বৃদ্ধির হার আয় বৃদ্ধির হারকে কত দ্রুত ছাড়িয়ে যাচ্ছে।

বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত এক বছর ধরে মহাকাশে ভাসমান স্পেসএক্সের একটি রকেটের ধ্বংসাবশেষ বুধবার ভোরে চাঁদের পৃষ্ঠে আছড়ে পড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যদিও সংঘর্ষের ছবি এখনও প্রক্রিয়াকরণ করা হয়নি। রকেটটি অ্যাপোলো ১১-এর অবতরণ স্থল থেকে চাঁদের অপর পাশে অবস্থিত আইনস্টাইন ক্রেটারের কাছে বিধ্বস্ত হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। এই এলাকায় দিনের আলো পৌঁছায় এবং পৃথিবী থেকে দৃশ্যমান।

আইজির প্রধান বাজার বিশ্লেষক ক্রিস বিউচ্যাম্প সিএনবিসিকে বলেন, 'আজ সকালে স্পেসএক্সের একটি রকেটের অংশ চাঁদে বিধ্বস্ত হওয়া সম্ভবত শেয়ারের দামের পারফরম্যান্সের জন্য একটি ভালো রূপক।'

মরগান স্ট্যানলির বিশ্লেষকরা গত মাসে লিখেছিলেন, স্পেসএক্সের শেয়ারের দর যদি ১০০ ডলারের নিচে নেমে যায়, তাহলে বোঝা যাবে বিনিয়োগকারীরা রকেট নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের এআই ব্যবসায় কোনো মূল্য দেখছেন না। বিশ্লেষকদের মতে, কেউ কেউ ইতিমধ্যেই স্পেসএক্সের 'শূন্য বা ঋণাত্মক মূল্য' দেখছেন, কারণ কোম্পানি 'বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অনিশ্চিত অর্থনীতি'র মধ্যে মহাকাশ ও সংযোগ খাতে ব্যয় বাড়াচ্ছে।

ফোর্বসের হিসাব অনুযায়ী, স্পেসএক্সের শেয়ারের পতনে এলন মাস্কের সম্পদ ৮১ বিলিয়ন ডলার কমে ৭০১.৫ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। মঙ্গলবার স্পেসএক্সের আয়ের প্রতিবেদনের আগে তার সম্পদ ৫৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি বেড়ে গিয়েছিল। বুধবারের পতনের পরও তার সম্পদ বিশ্বের দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধনী ব্যক্তি—গুগলের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ল্যারি পেজ (৩০৯ বিলিয়ন ডলার) এবং অ্যামাজনের জেফ বেজোসের (২৭৮.৩ বিলিয়ন ডলার) চেয়ে অনেক বেশি।

এই আয়ের প্রতিবেদনটি জুন মাসে স্পেসএক্সের ঐতিহাসিক শেয়ারবাজারে অভিষেকের পর প্রথম ত্রৈমাসিক আর্থিক হালনাগাদ। ১৬ জুন সর্বোচ্চ ২২০ ডলারের বেশি শেয়ারের দরে পৌঁছানোর পর থেকে স্পেসএক্সের শেয়ারের মূল্য অর্ধেকের বেশি কমে গেছে, যদিও বিশ্লেষকরা এখনও কোম্পানির ব্যবসায়িক সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদী। গত মাসে সফল স্টারশিপ পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণের পরও শেয়ারের দর প্রায় ৫% কমে যাওয়ায় স্পেসএক্সের শেয়ারকে সবুজ অঞ্চলে ফিরিয়ে আনার মতো কিছুই ঘটেনি বলে মনে হচ্ছে।