নতুন সিনেমা ‘ম্যায় ওয়াপাস আউঙ্গা’র মাধ্যমে পরিচালক ইমতিয়াজ আলী দর্শকদের নিয়ে গেছেন দেশভাগের রক্তাক্ত ইতিহাসের ভেতরে, যেখানে ব্যক্তিগত প্রেমের গল্প হয়ে উঠেছে বৃহত্তর মানবিক বেদনার প্রতীক। ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র ৯৫ বছর বয়সী ইশার সিং গ্রেওয়াল, যিনি নাসিরউদ্দিন শাহ অভিনয় করেছেন। স্ট্রোকের পর হাসপাতালে ভর্তি হওয়া এই বৃদ্ধের অসংলগ্ন প্রলাপ, হঠাৎ আবেগের বহিঃপ্রকাশ আর ভাঙাচোরা স্মৃতির টুকরোগুলোই যেন পুরো কাহিনির সূত্রপাত ঘটায়।

লন্ডনে অভিবাসী জীবনযাপন করা নাতি নিভি (দিলজিৎ দোসাঞ্জ) দাদার দেখাশোনার দায়িত্ব নিতে দেশে ফিরে আসে। বৃদ্ধের বিচ্ছিন্ন কথাগুলোকে সে অর্থহীন ভাবে না; বরং প্রতিটি শব্দের পেছনের অর্থ খুঁজতে থাকে। ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয় ৭৮ বছর ধরে চাপা পড়ে থাকা এক রহস্য—দেশভাগের আগে পাঞ্জাবে হারিয়ে যাওয়া এক প্রেমের গল্প। তরুণ কিনু (বেদাং রায়না) আর মুসলিম তরুণী আফসানার (শর্বরী বাগ) নিষ্পাপ প্রেম, চোখাচোখি আর লুকিয়ে দেখা করার সেই দিনগুলো। কিন্তু র্যাডক্লিফ লাইন যেন তাদের ভালোবাসার পথে প্রাচীর হয়ে দাঁড়ায়। রাতারাতি বদলে যায় মানুষের পরিচয়; কিনুকে চলে আসতে হয় ভারতে, সঙ্গে কেবল একটি প্রতিশ্রুতি—‘আমি ফিরে আসব’।

স্মৃতিভ্রংশকে কেবল অসুস্থতা হিসেবে না দেখিয়ে এখানে সেটি অতীতে ফিরে যাওয়ার এক দরজা হয়ে উঠেছে, যা সিনেমাটিকে ব্যতিক্রমী মাত্রা দিয়েছে। নাতির এই অনুসন্ধান আসলে একটি হারিয়ে যাওয়া প্রেমের গল্প উদ্ধারের চেষ্টা, যা একই সঙ্গে ইতিহাসকে মানুষের গল্প দিয়ে বোঝার প্রয়াস। ছবিতে দেখানো হয়েছে কীভাবে দেশভাগের ভয়াবহতা, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, নারী নির্যাতন, লাশভর্তি ট্রেন আর বাস্তুচ্যুতি—সবকিছু মিলিয়ে ব্যক্তিগত প্রেমের কাহিনি পরিণত হয় এক বৃহত্তর শোকে। কিনুকে বেঁচে থাকার তাগিদে নিজের অতীত, প্রেম ও কৈশোরের সেই ১৭ বছর মুছে ফেলতে হয়েছিল; তাই পরবর্তী জীবনে তাকে ‘দূরত্ব বজায় রাখা বাবা’ হিসেবে দেখা যায়।

নাসিরউদ্দিন শাহর অভিনয় সিনেমার প্রাণ। স্মৃতি ও স্মৃতিভ্রংশ, বাস্তবতা ও বিভ্রমের দ্বন্দ্ব তাঁর অভিনয়ে জীবন্ত হয়ে ওঠে। আবেগঘন ক্লাইম্যাক্সে বৃদ্ধের চরিত্র যেন পর্দা ভেদ করে দর্শকের মনে দাগ কাটে। দিলজিৎ দোসাঞ্জও তার চরিত্রে মনে রাখার মতো অভিনয় করেছেন। তবে তরুণ কিনুর ভূমিকায় বেদাং রায়নার অভিনয়ে সেই গভীরতা পুরোপুরি ফুটে ওঠেনি, যা তাকে নাসিরউদ্দিন শাহর চরিত্রের বিশ্বাসযোগ্য পূর্বসূরি করে তুলতে পারত। অন্যদিকে আফসানার চরিত্রে শর্বরী বাগ তাঁর প্রাণবন্ত উপস্থিতি দিয়ে পুরোনো দিনের প্রেমের আবহকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছেন।

সম্পাদক আরতি বাজাজ অতীত-বর্তমান, স্মৃতি-বাস্তবতার সময়রেখাকে এমনভাবে মিলিয়েছেন যে কাহিনি চরিত্রটির মনের প্রবাহের মতো এগিয়ে চলে। এ আর রাহমানের সংগীত গল্পের আবহ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে; বিভিন্ন সংস্কৃতির সংগীতধারা মিশিয়ে তিনি এক ঘোর লাগানো সাউন্ডস্কেপ তৈরি করেছেন। তবে ছবিতে কিছু দুর্বলতাও চোখে পড়ে—কাবির চরিত্রায়ণ, নাতির স্ট্যান্ডআপ কমেডির প্রসঙ্গ এবং স্বেচ্ছায় অভিবাসনের সঙ্গে জোর করে বাস্তুচ্যুত হওয়ার তুলনা কিছুটা কৃত্রিম মনে হয়েছে।

ইমতিয়াজ আলীর আগের সিনেমাগুলোর বহু উপাদানের প্রতিধ্বনি পাওয়া যায় এই ছবিতে—‘যাব উই মেট’-এর পালিয়ে যাওয়া, ‘লাভ আজ কাল’-এর দ্বৈত সময়রেখা, ‘রকস্টার’ ও ‘তামাশা’র প্রেমের আবেগ, এমনকি ‘যাব হ্যারি মেট সেজাল’-এর শিকড়ের ট্রমার যোগসূত্রও। তবে এবার পরিচালক যেন নিজের পুরোনো গল্প বলার ধরনকেই প্রশ্ন করেছেন। এখানে প্রেমকে লড়তে হয়েছে পৃথিবীর সঙ্গে। অন্য অনেক দেশভাগের সিনেমার মতো এখানে কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে খলনায়ক বানানো হয়নি; বরং সহিংসতার পেছনে কাজ করা অমানবিক ইতিহাসকেই দায়ী করা হয়েছে। ছবিটি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে—আগের প্রজন্ম কি নিজেদের ট্রমা লুকিয়ে পরের প্রজন্মকে রক্ষা করতে চেয়েছিল? গভীর ক্ষতকে চাপা দিলে সেটি মুছে যায় না, বরং অন্য রূপে আরও প্রবলভাবে ফিরে আসে—এই সত্যটিই যেন সিনেমার মূল বার্তা।