দীর্ঘ ৩৯ বছর একই বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার পর অবশেষে অবসরে গেলেন বেলা রানী দেব। মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার বালিগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে ১৯৮৭ সালে যোগদানের পর থেকে তিনি আর অন্য কোথাও বদলি হননি। সোমবার দুপুরে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে তাঁর বিদায় উপলক্ষে আয়োজন করা হয় এক বর্ণিল সংবর্ধনার। আয়োজনে অংশ নেন বিদ্যালয়ের বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থী, অভিভাবক, সহকর্মী এবং স্থানীয় প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও। ফুল, উপহার আর ভালোবাসায় সিক্ত করার পর ঘোড়ার গাড়িতে করে প্রিয় শিক্ষককে বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়। ঘোড়ার গাড়ির সামনে ও পেছনে ছিল মোটরসাইকেলের বহর, যা পুরো বিদায় অনুষ্ঠানকে দিয়েছে রাজকীয় রূপ।
সোমবার সকাল থেকেই আকাশ ছিল মেঘলা, দুপুরে শুরু হয় হালকা থেকে ভারী বৃষ্টি। বৃষ্টির মধ্যেই বালিগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে মঞ্চ তৈরি করা হয়েছিল এবং প্যান্ডেলের নিচে সাজানো ছিল চেয়ার। বৃষ্টিতে বিদ্যালয়ের সবুজ মাঠ কাদায় পরিণত হলেও আয়োজকেরা থেমে থাকেননি; পানি সরাতে নালা কাটাসহ নানা ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। বিদ্যালয়ের প্রবেশপথের কাছেই একটি ঘোড়ার গাড়ি অপেক্ষমাণ ছিল। একপর্যায়ে বিদ্যালয়ে পৌঁছালে বেলা রানী দেবকে দেখে ছুটে আসেন শিক্ষার্থীরা। কেউ তাঁকে জড়িয়ে ধরেন, কেউ সালাম দেন, আর নারী অভিভাবকদের অনেকে তাঁকে আলিঙ্গন করেন। বিদায়ের আয়োজন হলেও মুহূর্তটি ছিল আনন্দ ও আবেগে মিশ্রিত।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক গৌরাঙ্গ চন্দ্র ধর সভাপতিত্ব করেন সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে। বক্তব্য দেন রাজনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বিপুল শিকদার, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুল জলিল তালুকদার, উপজেলা সহকারী শিক্ষক সমিতির আহ্বায়ক মো. রেজওয়ানুল হক, প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও লেখক মহিদুর রহমান এবং অন্যতম আয়োজক তুহিন জুবায়ের। বক্তব্য দিতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন বেলা রানী দেব নিজেও। অনুষ্ঠানের শেষ দিকে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ সারি দেখা যায়; কারও হাতে ফুল, কারও হাতে মালা, আবার কারও হাতে ছিল রঙিন উপহারের বাক্স। দল বেঁধে বা একা একা এসে তাঁরা প্রিয় শিক্ষকের হাতে উপহার তুলে দেন। সহকর্মী ও অভিভাবকেরাও তাঁকে উপহার দেন। বিদ্যালয় ভবন থেকে ঘোড়ার গাড়িতে ওঠার পথে রঙিন ধোঁয়ায় মুহূর্তটি স্মরণীয় করে তোলা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও লেখক মহিদুর রহমান বলেন, ভালো শিক্ষকের নির্দেশক তাঁর শিক্ষার্থীরা। অনেক শিক্ষক পাওয়া যায়, কিন্তু মনে থাকে এক-দুইজনকে; শিক্ষার্থীরা সেই এক-দুইজনকেই স্মরণ করেন। বেলা রানী দেব তাঁর কাজ দিয়ে অনেক শিক্ষার্থীর মনে জায়গা করে নিয়েছেন। সংবর্ধনার অন্যতম আয়োজক ও প্রাক্তন শিক্ষার্থী তুহিন জুবায়ের বলেন, তাঁরা তাঁকে দিদিমণি ডাকেন। তাঁরা তাঁর কাছে পড়েছেন, তাঁদের সিনিয়ররাও পড়েছেন। শৈশব থেকেই তাঁকে দেখে আসছেন। এত দিন বিদ্যালয়ে শিক্ষা দেওয়ার পর সম্মান জানানো তাঁদের কর্তব্য ছিল বলে মনে করেন তিনি। তাঁদের চেষ্টা ছিল এমন কিছু আয়োজন করা, যাতে অবসর সময়ে এই স্মৃতি মনে করে তিনি আনন্দ পান।
বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী মোহনা আক্তার, মেহজাবীন আক্তার ও জান্নাত আক্তার প্রিয় শিক্ষককে বিদায় জানাতে এসেছিলেন। তাঁরা জানান, বেলা রানী দেব খুব আনন্দ দিয়ে পড়াতেন এবং পাঠ্যসূচির বাইরেও জ্ঞান অর্জনের জন্য নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করতেন।
বিদ্যালয় থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে উত্তর নন্দীউড়া গ্রামে বেলা রানী দেবের বাড়ি। ১৯৮৭ সালে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগ দেওয়ার পর তাঁর আর অন্য কোথাও যেতে হয়নি। তাঁর স্বামী রবীন্দ্র লাল দেব সরকারি চাকরি করতেন, তিনি মারা গেছেন। তাঁদের এক ছেলে ও এক মেয়ে; ছেলে জার্মানিতে উচ্চশিক্ষা নিচ্ছেন, আর মেয়ে মায়ের সেই বিদ্যালয়েই সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত।
৩৯ বছরের বেশি সময় একই বিদ্যালয়ে কাটানোর অভিজ্ঞতা প্রসঙ্গে বেলা রানী দেব বলেন, তাঁর অনেক ছাত্রছাত্রী দেশে-বিদেশে। তাঁরা যে তাঁকে এতটা ভালোবাসে, সেটা তিনি আগে বুঝতে পারেননি। এই স্কুলটা তাঁর বা typed মতো, পরিবারের মতো। যারা শুরুতে শিক্ষার্থী ছিল, তাঁদের সন্তানকেও তিনি পড়িয়েছেন। আজকের আয়োজন দেখে তাঁর আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। কথা বলতে বলতে তাঁর গলা ভারী হয়ে আসে, চোখে জমে ওঠে অশ্রু। বিদায়ের মুহূর্তে শিক্ষার্থীরা দুই পাশে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়ায়, ড্রাম ও বাদ্যের তালে উড়তে থাকে রঙিন ধোঁয়া। এরপর ঘোড়ার গাড়িতে তুলে দেওয়া হয় তাঁকে, সামনে-পেছনে মোটরসাইকেলের বহর নিয়ে সেই পুরোনো পথ ধরে রাজকীয় সাজে এগিয়ে চলে গাড়ি। এই পথ দিয়ে হয়তো আর তাঁর বিদ্যালয়ে ফেরা হবে না, তবে এই রঙিন পথটি অনেক দিন তাঁর মনে থাকবে।




