নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলার বোতলাগাড়ি ইউনিয়নের কাঁঠারিপাড়া গ্রামের রবিউল ইসলাম (৫৪) এখন পরিচিত মুখ ‘নিয়তি দুম্বা ফার্ম’-এর মালিক হিসেবে। পৈতৃক কিছু জমি ছিল তাঁর এবং বড় ভাই রেজাউল ইসলামের (৫৬)। কৃষিকাজে প্রত্যাশিত সফলতা না মেলায় রেজাউল সৌদি আরবে পাড়ি জমান। সেখান থেকে রবিউলকে দুম্বা পালনের পরামর্শ দেন তিনি, যা ছিল এই সফল উদ্যোগের সূচনা। ২০২২ সালে দেশে ছুটিতে এসে রেজাউল দুটি দুম্বা সংগ্রহ করেন, পরে আরও ছয়টি দুম্বা এনে দেন ছোট ভাইকে। ‘টার্কি’ ও ‘আওয়াসি’ জাতের এই দুম্বা দিয়েই শুরু হয় খামারের পথচলা।

রবিউল জানান, এই জাতের দুম্বাগুলোর প্রজননক্ষমতা বেশ ভালো এবং বছরে দুইবার বাচ্চা দেয়। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই খামারে দুম্বার সংখ্যা বাড়তে থাকে, দুই বছরের মধ্যে তা ৬৫টিতে পৌঁছায়। এরপর তিনি দুম্বা বিক্রি শুরু করেন। বাংলাদেশের আবহাওয়ার সঙ্গে দুম্বাগুলো ভালোভাবেই খাপ খাইয়ে নিয়েছে বলেও জানান তিনি। শুরুর দিকে দুম্বাগুলো দিনভর চিৎকার করলেও এক-দুই মাসের মধ্যেই স্থানীয় পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেয়।

বৃহস্পতিবার দুপুরে খামারে দেখা যায়, বাড়ির পাশে দুই কক্ষের একটি বড় খামার তৈরি করা হয়েছে। কাঠের পাটাতনের মেঝেতে প্রায় এক ইঞ্চি পরপর ফাঁক রাখা হয়েছে, ফলে মলমূত্র নিচে পড়ে যায়। খামারের সামনের খোলা জায়গায় ছোট-বড় ৬০টি দুম্বা ঘোরাফেরা করছে, কোনোটি ঘাস খাচ্ছে, কোনোটি ছায়ায় বিশ্রাম নিচ্ছে। দুম্বাদের দেখভালের জন্য দুজন রাখাল রয়েছেন, যাঁরা দিনমজুরি ভিত্তিতে কাজ করেন। একজন রাখাল ৫০০ টাকা এবং অন্যজন ৪০০ টাকা দৈনিক মজুরি পান।

দুম্বার প্রধান খাবার কচি ঘাস। এর পাশাপাশি খইল, ভুসি, খড় এবং চিটাগুড়ে ভেজানো সাইলেজ দেওয়া হয়। খামারের মালিকের মতে, দুম্বা পালনে খাবার ও পরিচর্যার খরচ তুলনামূলকভাবে কম, তাই সঠিক পরিচর্যায় ভালো লাভ সম্ভব। সারা বছরই কমবেশি দুম্বা বিক্রি হয় তাঁর খামার থেকে, অনলাইন ও সরাসরি দুইভাবেই ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ হয়। ২০২৫ সালের কোরবানির ঈদে ২৭টি এবং ২০২৬ সালের ঈদে ৩০টি দুম্বা বিক্রি হয়েছে। প্রতিটি দুম্বার ওজন ৫০ থেকে ৮০ কেজি, যা ৮০ হাজার থেকে আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। স্থানীয় চাহিদার কারণে দুম্বা জবাই করে প্রতি কেজি ৩ হাজার টাকা দরে মাংসও বিক্রি করেন রবিউল। ঢাকা ও বিভিন্ন বিভাগীয় শহর থেকে পাইকাররা এসে দুম্বা কিনে নিয়ে যান, আবার কেউ খামারে পালনের উদ্দেশ্যেও সংগ্রহ করেন।

ইসলামী ঐতিহ্যে দুম্বার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে উল্লেখ করে সৈয়দপুরের মাওলানা সাইদুল ইসলাম বলেন, মুসলিমপ্রধান দেশ হিসেবে বাংলাদেশে কোরবানির বাজারে দুম্বার চাহিদা বৃদ্ধির সুযোগ রয়েছে, ফলে এ ধরনের খামারের ব্যাপক সম্ভাবনা আছে। রবিউলের খামার দেখে গ্রামের অনেকেই দুম্বা পালনে আগ্রহী হয়েছেন বলে জানান প্রতিবেশী রফিকুল ইসলাম। খামার দেখতে আসা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নন্দিতা ইসলাম বলেন, জায়গাটি তার ভালো লেগেছে এবং একজন গ্রামীণ মানুষের নিরন্তর চেষ্টার ফসল এই খামার। সৈয়দপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. আবু কায়েস বিন আজিজ বলেন, মরুর প্রাণী দুম্বার এই খামার নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি করেছে এবং প্রাণিসম্পদ বিভাগ খামারটির ওপর নজর রাখছে। খামারে রোগবালাইয়ের সমস্যাও তেমন দেখা যায় না। ভবিষ্যতে এ ধরনের খামার আরও ছড়িয়ে পড়লে দেশের মাংসের চাহিদা পূরণে সহায়ক হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।