দেশের বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি গত জুন শেষে দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে, যা ইতিহাসে সর্বনিম্ন। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে এই প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ এবং এপ্রিলে ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ। ২০২০ সালে করোনা মহামারির চরম সময়েও এই হার সাড়ে ৭ শতাংশের ওপরে ছিল। অর্থাৎ, বর্তমান মন্দা অতীতের যেকোনো সংকটকে ছাড়িয়ে গেছে।

বেসরকারি খাতে ঋণের এহেন নিম্নমুখী প্রবণতার পেছনে একাধিক কারণ চিহ্নিত করেছেন সংশ্লিষ্টরা। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগে থেকেই শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়ে পড়েছে এবং সেগুলো চালুর উদ্যোগ প্রায় নেই বললেই চলে। নতুন বিনিয়োগে উৎসাহ কমে যাওয়ার পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে গ্যাস-বিদ্যুতের অনিশ্চয়তা। ব্যাংক কর্মকর্তাদের মতে, বর্তমানে যে পরিমাণ ঋণ বিতরণ হচ্ছে, তার বড় অংশ ভোগ্যপণ্য ও কাঁচামাল আমদানিতে ব্যবহৃত হচ্ছে। শিল্প-ব্যবসা খাতে ঋণের প্রবাহ খুবই সীমিত।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি নীতি সুদহার (রেপো রেট) ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৯ দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ করেছে, যা গত রোববার থেকে কার্যকর হয়েছে। দীর্ঘ ২১ মাস কঠোর মুদ্রানীতি অনুসরণের পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দাবি, অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনা করেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে ব্যাংকগুলোর অর্থ সংগ্রহের খরচ কমবে, যা ধীরে ধীরে ঋণের সুদহার কমিয়ে আনতে সাহায্য করতে পারে।

একইসঙ্গে সরকার বিভিন্ন খাতের জন্য স্বল্প সুদে ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলী জানিয়েছেন, অনেক ব্যাংক সমস্যায় পড়ায় ঋণ কার্যক্রম প্রায় গুটিয়ে নিয়েছে। তবে প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণ বিতরণ শুরু হলে এই পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। তিনি উৎপাদনশীল খাতে ঋণ প্রবাহিত করার ওপর জোর দিয়েছেন।

রাষ্ট্রমালিকানাধীন সোনালী ব্যাংকের ঋণসীমা তুলে নেওয়া হয়েছে, যার ফলে ব্যাংকটি এখন গ্রাহকের আবেদনের ভিত্তিতে ইচ্ছেমতো ঋণ দিতে পারবে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সুদহার কমলে ঋণের প্রবাহ বাড়তে পারে, কিন্তু এর ফলে অর্থ সরবরাহ বেড়ে নতুন করে মূল্যস্ফীতি দেখা দিতে পারে। এ কে খান গ্রুপের পরিচালক ও ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি আবুল কাসেম খান মনে করেন, অর্থনীতির সূচকগুলো দীর্ঘদিন ধরে খারাপ অবস্থায় রয়েছে। নতুন সরকার বেশ কিছু পরিবর্তনের কাজ শুরু করলেও এই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে দুই বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। তিনি আরও বলেন, বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে পুরোনো আইন পরিবর্তন করে ব্যবসা শুরু করাটা সহজ করতে হবে, যাতে নতুন প্রজন্ম এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আগ্রহী হন।

উদ্যোক্তারা অবশ্য গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে প্রধান প্রতিবন্ধকতা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। পাশাপাশি করনীতি, ঘুষ-দুর্নীতির মতো পুরোনো সমস্যাগুলোও বিনিয়োগের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিএনপি সরকার বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে এবং নির্বাচনী ইশতেহারে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার লক্ষ্য ঘোষণা করেছে। বিনিয়োগবান্ধব নীতির অংশ হিসেবে সুদহার কমানোকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।