মাইকেলসন-মোর্লি পরীক্ষার পুনরাবৃত্তি ঘটিয়েছিলেন দুই মার্কিন পদার্থবিজ্ঞানী রয় জে কেনেডি ও এডওয়ার্ড এম থর্নডাইক। তাঁদের পরীক্ষায় একটি বড় পার্থক্য ছিল—যন্ত্রের দুটি বাহুকে যথাসম্ভব সমান না রেখে বরং সেগুলোকে ভিন্ন ভিন্ন দৈর্ঘ্যের করা হয়েছিল। এরপর যন্ত্রটি ঘোরানো হলে তারা লক্ষ করেছিলেন যে দুই দিকে আলোর যাওয়া-আসার সময়ে কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি। সংকোচন তত্ত্ব অনুযায়ী, যন্ত্র ঘোরানোর সঙ্গে সঙ্গেই সময়ের এই পার্থক্য বদলে যাওয়ার কথা ছিল, যা দুটি রশ্মি পুনরায় মিলিত হলে ইন্টারফারেন্স ফ্রিঞ্জের পরিবর্তনের মাধ্যমে বোঝা যেত। কিন্তু তেমন কিছুই ঘটেনি।

আরও নিখুঁত পরীক্ষা পরিচালিত হয়েছে মসবাউয়ার আলোর উৎস ব্যবহার করে, যেখানে একটি টার্নটেবিলের দুই প্রান্তে রিসিভার বসানো হয়েছিল। মসবাউয়ার ইফেক্ট নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা পরবর্তীতে করা হবে। এই ধরনের সব পরীক্ষাই সংকোচন তত্ত্বকে ভুল প্রমাণ করেছে। লরেন্টজের সময়ে যদিও এসব পরীক্ষা করা সম্ভব ছিল না, তবু তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে তাত্ত্বিকভাবে এগুলো সম্পাদন করা সম্ভব। তিনি ধারণা করেছিলেন যে মাইকেলসনের পরীক্ষার মতো এসব পরীক্ষাও নেতিবাচক ফলাফল দেবে। সম্ভাব্য এই নেতিবাচক ফলাফলের ব্যাখ্যা দিতে লরেন্টজ তাঁর মূল তত্ত্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনেন—সময়ের পরিবর্তনের ধারণা।

লরেন্টজের মতে, ইথার বায়ুর কারণে ঘড়িগুলো ধীর হয়ে যাবে এবং এমনভাবে ধীর হবে যাতে আলোর বেগ সব সময় একই থাকে—সেকেন্ডে ২ লাখ ৯৯ হাজার ৮০০ কিলোমিটার। উদাহরণস্বরূপ, পৃথিবীর গতির দিকে A থেকে B বিন্দুতে আলোর বেগ মাপার চেষ্টা করা যাক। A-তে দুটি ঘড়ির সময় মিলিয়ে একটি ঘড়ি B-তে নিয়ে যাওয়া হলো। A থেকে আলোর রশ্মি কখন নির্গত হলো তা লিখে রাখা হলো, আর B-তে পৌঁছানোর সময় মাপা হলো অন্য ঘড়ি দিয়ে। ইথার বায়ুর বিপরীতে যাওয়ায় আলোর গতি কমানোর কথা, কিন্তু ঘড়িটি যখন A থেকে B-তে যায়, তখন সেটিও ইথার বায়ুর বিপরীতে যায়, ফলে B-তে থাকা ঘড়িটি ধীর হয়ে যায়। ফলে আলোর বেগ মাপলে তা আবার সেই একই মান দেখায়।

উল্টো দিক থেকেও একই ঘটনা ঘটে। B থেকে A-তে আলোর বেগ মাপার সময় B-তে দুটি ঘড়ির সময় মিলিয়ে একটি ঘড়ি A-তে নিয়ে যাওয়া হয়। এবার আলো ইথার বায়ুর সঙ্গে যাওয়ায় তার গতি বেড়ে যায়, কিন্তু ঘড়িটি B থেকে A-তে নিয়ে যাওয়ার সময় সেটিও বাতাসের সঙ্গে যায়, ফলে ঘড়িটি দ্রুত চলে। তাই A-তে থাকা ঘড়িটি B-তে থাকা ঘড়ির চেয়ে এগিয়ে যায়, এবং আলোর বেগ আবার সেই একই মান দেখায়।

লরেন্টজের নতুন তত্ত্ব শুধু মাইকেলসন-মোর্লি পরীক্ষার নেতিবাচক ফলাফলের ব্যাখ্যা দেয়নি, বরং ইথার বায়ুর কারণে আলোর বেগে যেকোনো পরিবর্তন ধরার উদ্দেশ্যে করা যেকোনো পরীক্ষার জন্যও ব্যাখ্যা তৈরি করেছিল। তাঁর দৈর্ঘ্য ও সময়ের পরিবর্তনের সমীকরণগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল যে যেকোনো প্রসঙ্গ কাঠামো থেকে আলোর বেগ মাপার যেকোনো পদ্ধতিতেই সব সময় একই ফলাফল পাওয়া যাবে।

পদার্থবিজ্ঞানীরা এই তত্ত্ব নিয়ে খুশি ছিলেন না। তাঁদের কাছে এটি ছিল আক্ষরিক অর্থেই অ্যাডহক—ইথার তত্ত্বের ফুটো সারাতে এক অদ্ভুত প্রচেষ্টা। তত্ত্বটি প্রমাণ বা ভুল প্রমাণ করার কোনো কল্পনীয় উপায় ছিল না। বিজ্ঞানীদের পক্ষে বিশ্বাস করা কঠিন ছিল যে প্রকৃতি ইথার বায়ুকে লুকিয়ে রাখতে এত চরম ও পাগলাটে আচরণ করবে। ব্রিটিশ জ্যোতির্বিদ আর্থার স্ট্যানলি এডিংটন লুইস ক্যারলের 'থ্রু দ্য লুকিং-গ্লাস' থেকে হোয়াইট নাইটের গানের লাইন উদ্ধৃত করে পরিস্থিতি বর্ণনা করেছিলেন: 'কিন্তু আমি একটা উপায় ভাবছিলাম কীভাবে গোঁফ জোড়া সবুজ করা যায়, আর সব সময় এত বড় একটা পাখা ব্যবহার করব যাতে সেগুলো কেউ দেখতে না পায়।' লরেন্টজের তত্ত্ব, যাতে দৈর্ঘ্য ও সময়ের পরিবর্তন উভয়ই ছিল, হোয়াইট নাইটের পরিকল্পনার মতো হাস্যকর মনে হয়েছিল। তবে বিজ্ঞানীরা শত চেষ্টা করেও এর চেয়ে ভালো কোনো পরিকল্পনা বের করতে পারেননি। পরবর্তী পর্বে দেখা যাবে, আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব কীভাবে এই বিভ্রান্তি থেকে বের হওয়ার পথ দেখিয়েছিল।