জন্মশতবর্ষ অতিক্রম করে কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের কণ্ঠ আজও বঞ্চিত ও ক্ষুধার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার বহন করে। নগরের হৃদয়হীন ইট-পাথরের পরিসরে বাস করলেও তিনি কৃষকের মাটি ও সংগ্রামের সঙ্গে গভীর আত্মীয়তা গড়ে তুলেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের ‘ঐকতান’ কবিতার কৃষাণের জীবন-সাথীর ধারণাকে নিজের চেতনায় ধারণ করে তিনি অসামান্য কবিতা রচনা করেন। তাঁর জন্ম নগরে, ফসলের খেত থেকে বহু দূরে সামাজিক অবস্থান হলেও কৃষকের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও লড়াই তাঁর কবিতার মূল সুর হয়ে ওঠে।

তাঁর সৃজনবিশ্বের কেন্দ্রে ছিল ক্ষুধা, শোষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ। কৈশোর-তারুণ্যের প্রচলিত প্রেমকবিতা এড়িয়ে তিনি সমাজদেহের নানা ব্যাধিকে বিষয় হিসেবে বেছে নেন। শুধু রোগ নির্ণয় নয়, নিরাময়ের উপায়ও নির্দেশ করেন তিনি। স্নায়ুছেঁড়া বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে তিনি উপলব্ধি করেন—প্রেম-সৌন্দর্যের স্বপ্নময় ভাবলোক নয়, জীবনসংগ্রামের রূঢ় বাস্তবতাকেই মূর্ত করতে হবে কবিতায়।

১৯৪৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তেভাগা আন্দোলনের খবরে শিহরিত হয়ে তিনি রচনা করেন ‘দুর্মর’। হিমালয় থেকে সুন্দরবন পর্যন্ত বাংলাদেশের জেগে ওঠা কোলাহলের বর্ণনায় তিনি লেখেন—‘হয় ধান নয় প্রাণ’—এই শব্দে সারা দেশ দিশাহারা হয়ে ওঠে। কৃষকদের বলিষ্ঠ উত্থানকে তিনি অভূতপূর্ব আশাবাদের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, কৃষক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে জন্ম নিয়েছে সচেতনতার ধান, যা আকালের মৃত্যুকে মুছে বাংলার প্রাণ ফিরিয়ে আনে।

মার্ক্সবাদী সমাজদৃষ্টিকে তিনি শিল্পরূপে উপস্থাপন করেন। ‘চারাগাছ’ কবিতায় প্রাচীন প্রাসাদের গায়ে অশ্বত্থগাছের চারা দেখা যায়—এই চারা একদিন শিকড়ের শক্তিতে গর্বোদ্ধত প্রাসাদরূপী পুঁজিবাদী সভ্যতার পতন ঘটাবে। ‘ছাড়পত্র’ কাব্যের ‘হে মহাজীবন’ তাঁর সাহিত্যচর্চার মূল দর্শন। সেখানে তিনি ঘোষণা করেন—কবিতার স্নিগ্ধতা প্রয়োজন নেই; ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়, পূর্ণিমা-চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি। মানবতাবাদী কবি হিসেবে তিনি জনগণের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা বারবার মূর্ত করেন। তিনি অঙ্গীকার করেন যে, যতক্ষণ দেহে প্রাণ থাকবে ততক্ষণ পৃথিবীর জঞ্জাল সরানোর চেষ্টা অব্যাহত থাকবে; নবজাতকের কাছে বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি তাঁর কাব্য ও জীবনসাধনার অভিন্ন লক্ষ্য।

কমিউনিস্ট পার্টির কাজে জীবন উৎসর্গ করেন তিনি। ঢাকায় গল্পকার সোমেন চন্দ নিহত হওয়ার পর ফ্যাসিস্টবিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘে যুক্ত হন। ১৯৪৫ সালে মেজো বউদিকে পাঠানো একটি চিঠিতে তিনি স্পষ্ট করেন—কবি হিসেবে নির্জনতাপ্রিয় হওয়ার কোনো অবকাশ তাঁর নেই; তিনি জনতার কবি হতে চান। কবির পরিচয়ের চেয়ে তাঁর কমিউনিস্ট পরিচয়ই বড়—এই উক্তি তাঁর রাজনৈতিক ও সাহিত্যিক পরিচয়ের অভিন্নতা প্রকাশ করে। ঔপনিবেশিক শাসনে বিপর্যস্ত স্বদেশবাসীর যন্ত্রণা তাঁর কণ্ঠে ফুটে ওঠে—এই দেশে জন্মগ্রহণ করলে কেবল পদাঘাতই প্রাপ্তি।

১৯৩৯ থেকে ১৯৪৭ সালের ঘটনাবহুল সময়কালে তাঁর কবিতায় ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই, শ্রমিক ধর্মঘট, ১৯৪২ সালের আগস্ট আন্দোলন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের উত্তাপ, কালোবাজারি ও মজুতদারির দৌরাত্ম্য, আজাদ হিন্দ ফৌজের লড়াই, নৌবিদ্রোহ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের ছায়া স্পষ্ট। জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড ও চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের ঘটনাও তাঁর সাহিত্যে প্রতিফলিত হয়। ‘রানার’ কবিতায় ডাকহরকরা বা রানার শোষিত ও শ্রমজীবী মানুষের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপিত হন। দারিদ্র্য ও হতাশায় ক্লিষ্ট জীবনের চিত্র মর্মস্পর্শী ভাষায় তুলে ধরেন তিনি। ‘বিবৃতি’ কবিতায় তিনি আহ্বান জানান—রাত্রির গভীর বৃন্ত থেকে ছিঁড়ে আনতে হবে ফুটন্ত সকাল।

দুর্ভিক্ষ তাঁর কবিতায় দুঃস্বপ্নের মতো ফিরে আসে। ‘ঐতিহাসিক’ কবিতায় তিনি মনে করিয়ে দেন—দুর্ভিক্ষ জাতি, ধর্ম, বর্ণ বা সম্প্রদায় চেনে না; সবাই আক্রান্ত হয় এর করাল গ্রাসে। ‘বোধন’ কবিতায় মজুতদার ও কালোবাজারিদের নির্মূলের জন্য প্রতিশোধের সংকল্প ব্যক্ত করেন। ‘রবীন্দ্রনাথের প্রতি’ কবিতায় নিজেকে ‘দুর্ভিক্ষের কবি’ বলে পরিচয় দেন। আন্তর্জাতিক স্তরেও তাঁর দৃষ্টি বিস্তৃত ছিল। ‘রোম: ১৯৪৩’ কবিতায় সোভিয়েত ইউনিয়নের শক্তিশালী ভূমিকার প্রশংসা করেন। ‘প্রিয়তমাসু’ কবিতায় জাতীয়তা ও আন্তর্জাতিকতার অনবদ্য সমন্বয় ঘটে; সেখানে তিনি নিজেকে দেশপ্রেমী সৈনিকের অবয়বে উপস্থাপন করেন, যিনি দেশ ও পৃথিবীর প্রতি সমান দায়বদ্ধ।

কবিতার পাশাপাশি তাঁর পাঁচটি গল্প—‘ক্ষুধা’, ‘দরদী কিশোর’, ‘দুর্বোধ্য’, ‘কিশোরের স্বপ্ন’ ও ‘ভদ্রলোক’—ক্ষুধা ও বঞ্চনার জীবন্ত দলিল। ১৯৪৩ সালের মন্বন্তরের ভয়াবহ স্মৃতি নিয়ে তিনি ‘আকাল’ নামের কবিতা সংকলন সম্পাদনা করেন। সেখানে নিজের কবিতার পাশাপাশি বুদ্ধদেব বসু, বিষ্ণু দে, অরুণ মিত্র, প্রেমেন্দ্র মিত্রসহ অন্য কবি-সাহিত্যিকদের রচনাও অন্তর্ভুক্ত ছিল। সম্পাদক হিসেবে ‘কথামুখ’-এ তিনি ১৩৫০ বঙ্গাব্দকে শুধু একটি সাল নয়, ‘একটি দেশ শ্মশান হয়ে যাওয়ার ইতিহাস’ হিসেবে বর্ণনা করেন। সেই মন্বন্তরে খাদ্যের অভাব, ম্যালেরিয়া, কলেরা ও অপুষ্টির কারণে ৩০ লক্ষ মানুষের মৃত্যু ঘটে।

অত্যাচারী ও শোষক জমিদারের বিরুদ্ধে ‘ভাল খাবার’ ছড়ায় তীব্র বিদ্রূপ মেরেছেন তিনি। প্রবল প্রতাপশালী জমিদার ধনপতি পালের খাদ্যাভ্যাস ও অরুচির বর্ণনায় শেষ পর্যন্ত নায়েবের মুখে উচ্চারিত হয়—গরিবের রক্তই সবচেয়ে উৎকৃষ্ট খাদ্য। এই বিদ্রূপ শোষণের নির্মমতাকে নগ্ন করে তোলে।

অক্লান্ত পরিশ্রম ও ধারাবাহিক অসুস্থতার কারণে তাঁর অকালমৃত্যু ঘটে। নব্বইয়ের দশকে সমাজতান্ত্রিক শিবিরের পতনের পর সুকান্তচর্চায় ভাটা পড়ে। তবে শুধু রাজনৈতিক উত্থান-পতনের মাপকাঠিতে তাঁর সাহিত্য মূল্যায়ন যথার্থ নয়। প্রকৃত সাহিত্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে উপলব্ধি করা যায়—ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী আজও গদ্যময়। শতবর্ষে পা রাখা এই কবির উচ্চারণ তাই পুরোনো হয় না। যতদিন পৃথিবীতে অসাম্য, শোষণ ও ক্ষুধা থাকবে, ততদিন সুকান্তের সাহিত্য বঞ্চিত ও ক্ষুধার্ত মানুষের বলিষ্ঠ প্রতিনিধি হিসেবে বেঁচে থাকবে।