বাংলালিংক সম্প্রতি বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) কাছে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়ে স্যাটেলাইটভিত্তিক ‘ডিরেক্ট-টু-সেল’ (ডিটিসি) সেবার বাণিজ্যিক অনুমোদনের আবেদন জানিয়েছে। অপারেটরটি স্টারলিংকের সঙ্গে অংশীদারত্বে এই উদ্ভাবনী যোগাযোগব্যবস্থা চালু করতে চায়, যার পরীক্ষামূলক কার্যক্রম ইতিমধ্যে সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে বলে তারা দাবি করছে। অনুমোদন মিললে প্রাথমিক পর্যায়ে এসএমএস ও লাইট ডেটা সেবা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে; পরবর্তী সময়ে ভয়েস ও পূর্ণাঙ্গ ডেটা সেবাও যুক্ত করা যাবে।

এই প্রযুক্তির মূল বৈশিষ্ট্য হলো, প্রচলিত মোবাইল টাওয়ারের ওপর নির্ভর না করেই সাধারণ মুঠোফোন থেকে সরাসরি মহাকাশে থাকা স্যাটেলাইটে সংকেত পাঠানো সম্ভব। ফোন থেকে প্রেরিত বার্তা প্রথমে নিকটবর্তী টাওয়ারে না গিয়ে সরাসরি উপগ্রহে পৌঁছায়; সেখান থেকে গ্রাউন্ড স্টেশনের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট অপারেটরের নেটওয়ার্কে যুক্ত হয়ে আদান-প্রদান সম্পন্ন হয়। ফলে কোনো এলাকায় টাওয়ার না থাকলে কিংবা দুর্যোগে স্থলভিত্তিক অবকাঠামো অচল হয়ে পড়লে, প্রযুক্তিগতভাবে উপযোগী সাধারণ ফোর-জি মুঠোফোন ব্যবহার করেই সীমিত যোগাযোগ বজায় রাখা যায়। আলাদা কোনো স্যাটেলাইট ফোন বা বিশেষ যন্ত্রের প্রয়োজন পড়ে না।

পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে চলতি বছরের এপ্রিলে বাংলালিংক বিটিআরসির অনুমতি চেয়েছিল; মে মাসে সরকার দুই মাসের প্রুফ অব কনসেপ্ট (পিওসি) পরীক্ষার ছাড়পত্র দেয়। বান্দরবান ও সন্দ্বীপসহ নেটওয়ার্ক কভারেজের বাইরে থাকা বিভিন্ন দুর্গম স্থানে এই প্রযুক্তি যাচাই করা হয়। বাংলালিংকের তথ্য অনুযায়ী, পরীক্ষাকালে বিটিআরসি, ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি ও নিরাপত্তা সংস্থার কর্মকর্তাদের সামনে এসএমএস, ওটিটি-ভিত্তিক মেসেজিং ও ওটিটি ভয়েস কলসহ বিভিন্ন কার্যকারিতা প্রদর্শন করা হয়েছে।

চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, প্রাকৃতিক দুর্যোগে যখন প্রচলিত টাওয়ার বা ফাইবার নেটওয়ার্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন ডিটিসি বিকল্প যোগাযোগমাধ্যম হিসেবে কাজ করতে সক্ষম। এ ছাড়া গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়া জেলে ও অন্যান্য সামুদ্রিক পেশাজীবী, যারা স্থলভিত্তিক নেটওয়ার্কের আওতার বাইরে থাকেন, তাঁরাও এর মাধ্যমে সংযুক্ত থাকার সুযোগ পাবেন। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, কমিশনের নির্ধারিত সব শর্ত ও নির্দেশনা মেনে চলতে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

বাংলালিংকের চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স অফিসার তৈমুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘স্টারলিংকের ডিরেক্ট-টু-সেল প্রযুক্তি দুর্গম ও প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের যোগাযোগব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। সফলভাবে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শেষ করার পর আমরা এখন প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রক অনুমোদনের অপেক্ষায় আছি। অনুমোদন পাওয়া গেলে বাণিজ্যিকভাবে এই উদ্ভাবনী প্রযুক্তি চালু করা সম্ভব হবে।’

বর্তমানে দেশে চারটি মোবাইল অপারেটরের মোট গ্রাহক সংখ্যা প্রায় ১৯ কোটির কাছাকাছি; এর মধ্যে মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারী প্রায় ১২ কোটি। অপারেটরগুলোর নিজস্ব টাওয়ারের সংখ্যা ২১ হাজার ৩৬৯টি এবং ভাগাভাগি করে ব্যবহৃত টাওয়ার সাত হাজারের বেশি। তবু দেশের সব অঞ্চলে নেটওয়ার্ক পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। বিশেষত দুর্গম পাহাড়ি এলাকা, চর, দ্বীপ, উপকূল ও গভীর সমুদ্রে স্থলভিত্তিক অবকাঠামো নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের খরচ তুলনামূলকভাবে বেশি; কম জনবসতিপূর্ণ বা প্রত্যন্ত এলাকায় নতুন টাওয়ার স্থাপনে অপারেটরদের আগ্রহও কম। ডিটিসি সেই সীমাবদ্ধতা কিছুটা কমানোর পথ খুলে দিতে পারে, যেখানে টাওয়ার স্থাপন কঠিন সেখানে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সাধারণ মুঠোফোনে সীমিত ব্যান্ডউইথে যোগাযোগসেবা দেওয়া সম্ভব হবে।

তবে বাণিজ্যিক অনুমোদনের পথে কয়েকটি জটিলতা রয়ে গেছে। বিটিআরসি যে অনুমতি দিয়েছিল, তা ছিল কেবল পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের জন্য; ভবিষ্যতের বাণিজ্যিক ছাড়পত্রের নিশ্চয়তা হিসেবে তা গণ্য হবে না—এমন শর্তও ছিল। বাংলাদেশের নিজস্ব নিয়ন্ত্রক কাঠামোতেও প্রশ্ন রয়েছে: বিটিআরসির এনজিএসও (নন-জিওস্টেশনারি অরবিট) স্যাটেলাইট সার্ভিসের গাইডলাইনে ‘স্যাটেলাইট ও স্থলভিত্তিক আইএমটি সেবা’ দেওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়েও আইটিইউর আওতায় মুঠোফোন সেবার জন্য নির্ধারিত আইএমটি ব্যান্ড স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ব্যবহারের বিষয়ে সিদ্ধান্ত এখনো চূড়ান্ত হয়নি; ২০২৭ সালের ওয়ার্ল্ড রেডিওকমিউনিকেশন কনফারেন্সে (ডব্লিউআরসি) এ নিয়ে সিদ্ধান্ত হওয়ার কথা। যদিও কমিশনের একটি সূত্র বলছে, ডিটিসি প্রযুক্তির বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

বিটিআরসি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদ উল বারী প্রথম আলোকে জানান, ডিরেক্ট-টু-সেল প্রযুক্তির পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের প্রতিবেদন এখনো কমিশনের হাতে আসেনি। প্রতিবেদন পাওয়ার পরই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।