দেশের নানা প্রান্তে টানা বর্ষণে জলাবদ্ধতা ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ করে চট্টগ্রামে পাহাড়ধস ও ঢাকার সড়ক তলিয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে সম্প্রতি। এ অবস্থায় সবার নজর থাকে আবহাওয়ার পূর্বাভাসের দিকে। রাজধানীতে মাত্র ছয় ঘণ্টায় ৭৬ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। কিন্তু এই ৭৬ মিলিমিটার বৃষ্টি আসলে কী বোঝায়, তা বেশিরভাগ মানুষের কাছেই স্পষ্ট নয়।

বৃষ্টিপাত পরিমাপের আন্তর্জাতিক একক হলো মিলিমিটার। কোনো সমতল পৃষ্ঠে বৃষ্টির পানি যদি কোথাও না গড়ায়, মাটিতে শোষিত না হয় বা বাষ্প হয়ে না উড়ে যায়, তাহলে সেই পানি কত উচ্চতা পর্যন্ত জমত, সেটিই মিলিমিটারে প্রকাশ করা হয়। এ জন্য 'রেইন গেজ' নামে একটি বিশেষ পাত্র ব্যবহার করা হয়। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিদর্শক মো. আশরাফুল আলমের বরাতে জানা যায়, দেশের প্রতিটি পর্যবেক্ষণকেন্দ্রে এই যন্ত্র রয়েছে। তিন ঘণ্টা পর পর বৃষ্টির পরিমাণ রেকর্ড করা হয়। ম্যানুয়াল রেইন গেজটি মাটি থেকে প্রায় ৩০ ইঞ্চি ওপরে স্থাপন করা হয়, যাতে গাছপালা বা ভবন বৃষ্টির পরিমাপে প্রভাব না ফেলে। বর্তমানে দেশের ২২৫টির বেশি অটোমেটিক ওয়েদার স্টেশন থেকেও বৃষ্টির তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।

ছয় ঘণ্টায় ৭৬ মিলিমিটার বৃষ্টির অর্থ হলো, ওই সময়ে সমতল কোনো পাত্রে পানি জমলে তার উচ্চতা দাঁড়াত ৭ দশমিক ৬ সেন্টিমিটার। তবে বাস্তবে পানি মাটিতে শোষিত ও নালায় গড়িয়ে যাওয়ায় এত গভীরে পানি জমে না। কিন্তু অল্প সময়ে এত বৃষ্টি শহরে জলাবদ্ধতা, পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধস ও নিচু স্থানে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বাড়ায়। আবহাওয়া অধিদপ্তরের সংজ্ঞা অনুযায়ী, ২৪ ঘণ্টায় ৪৪ থেকে ৮৮ মিলিমিটার বৃষ্টিকে 'ভারী বৃষ্টি' এবং তার বেশি হলে 'অতি ভারী বৃষ্টি' বলা হয়। ১ মিলিমিটার বৃষ্টি মানে প্রতি বর্গমিটারে প্রায় ১ লিটার পানি পড়া।

বাংলাদেশের বৃষ্টির সিংহভাগই হয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে, যা সাধারণত মে মাসের শেষ থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সক্রিয় থাকে। এ সময়ে দেশের মোট বৃষ্টির ৮০ শতাংশ হয়ে থাকে। দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ২৪ ঘণ্টার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয় ২০০১ সালের ১৪ জুন চট্টগ্রামের সন্দ্বীপে; সে সময় বৃষ্টি হয়েছিল ৫৯০ মিলিমিটার। বঙ্গোপসাগর থেকে আসা আর্দ্র বাতাস পাহাড়ে বাধা পেয়ে প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটায়—এ কারণেই সিলেট ও পার্বত্য চট্টগ্রাম সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপ্রবণ অঞ্চল।

বর্তমান বৃষ্টির কারণ প্রসঙ্গে আবহাওয়াবিদ মো. বজলুর রশীদের মন্তব্য, এবার উত্তর-পূর্ব বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপের গতি ভিন্ন থাকায় চট্টগ্রাম বিভাগে বেশি বৃষ্টি হয়েছে। অপরদিকে মৌসুমি বায়ু স্বাভাবিকের চেয়ে সাত দিন পরে এসে সক্রিয় হওয়ায় জুলাইয়ের শুরুতেই ভারী বৃষ্টি শুরু হয়। এল নিনোর বিপরীতমুখী প্রতিক্রিয়াও এই বৃষ্টির জন্য দায়ী বলে মনে করেন তিনি। গত জুন মাসে স্বাভাবিকের চেয়ে ৩০ শতাংশ কম বৃষ্টি হলেও জুলাইয়ে পরিস্থিতি বদলে যায়। উল্লেখ্য, জুলাই মাসে বাংলাদেশের গড় বৃষ্টিপাত ৫২৩ মিলিমিটার।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের আজ সকালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের সর্বোচ্চ বৃষ্টি হয়েছে পটুয়াখালীতে (১৩২ মিলিমিটার)। রাজধানীতে বৃষ্টি হয়েছে ৯৭ মিলিমিটার। দিনাজপুর ও পঞ্চগড় ছাড়া দেশের প্রায় সব জায়গায় বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। আগামী কয়েক দিন দেশের অধিকাংশ এলাকায় বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে বলে পূর্বাভাসে জানানো হয়েছে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম, সিলেট ও উপকূলীয় অঞ্চলে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা বেশি।