বিশ্ব অর্থনীতির মানচিত্রে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন ঘটেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ডিরেকশন অব ট্রেড স্ট্যাটিস্টিকসের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, বিশ্বের ১৫১টি দেশের প্রধান বাণিজ্য অংশীদার এখন চীন। মাত্র দুই দশক আগেও এই সংখ্যা ছিল নেহাতই নগণ্য—২০০০ সালে মাত্র ৩৩টি দেশের সঙ্গে চীনের বাণিজ্য যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে বেশি ছিল। ভিজ্যুয়াল ক্যাপিটালিস্টের এক প্রতিবেদনে এই চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

চীনের এই অভূতপূর্ব উত্থানের পেছনে রয়েছে ১৯৭৮ সালে দেং জিয়াওপিংয়ের নেতৃত্বে শুরু হওয়া বাজারমুখী সংস্কার। এর আগে মাও সেতুংয়ের শাসনামলে শিল্পভিত্তি ও অবকাঠামোতে যে ভিত তৈরি হয়েছিল, পরবর্তী সংস্কারগুলো সেই ভিতের ওপর দাঁড়িয়েই অভূতপূর্ব প্রবৃদ্ধি অর্জন করে। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ ও রপ্তানিমুখী শিল্পায়ন—এই তিন স্তম্ভের ওপর ভর করে দেশটি ২০০১ সালে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (ডব্লিউটিও) যোগ দেওয়ার পর থেকেই বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে।

বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আমদানি-নির্ভরতার দিক থেকে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে কম্বোডিয়া। দেশটির মোট পণ্য আমদানির ৪৬ দশমিক ৮ শতাংশই আসে চীন থেকে। এরপরই অবস্থান মিয়ানমারের, যাদের আমদানির ৩৩ দশমিক ৫ শতাংশ চীনের ওপর নির্ভরশীল। পেরুতে এই হার ২৮ দশমিক ৭ শতাংশ। এশিয়ার বাইরেও চীনের প্রভাব সুস্পষ্ট—অস্ট্রেলিয়ার আমদানির ২৫ দশমিক ৫ শতাংশ, ব্রাজিল ও চিলির ২৪ দশমিক ৯ শতাংশ এবং রাশিয়ার ২৪ দশমিক ৮ শতাংশ পণ্য আসে চীন থেকে।

তবে শুধু উন্নয়নশীল দেশগুলোই চীনের ওপর নির্ভরশীল নয়। উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোও অনেকাংশে চীনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। জাপানের মোট আমদানির ২২ দশমিক ৫ শতাংশ, জার্মানির ১২ দশমিক ৩ শতাংশ, যুক্তরাজ্যের ১২ দশমিক ২ শতাংশ এবং ফ্রান্সের ৮ দশমিক ৮ শতাংশ পণ্যের উৎস এখন চীন। এমনকি রাজনৈতিকভাবে বিরোধ থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের মোট পণ্য আমদানির ১৩ দশমিক ৮ শতাংশ আসে চীন থেকে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও চীনের অবস্থান এখন শীর্ষে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ মোট ৬ হাজার ৭৪৪ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করেছে, যার মধ্যে ২ হাজার ৬১ কোটি ডলারই এসেছে চীন থেকে—যা মোট আমদানির প্রায় ৩০ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০২১-২২ অর্থবছরে এই হার ছিল ২৭ শতাংশ। শিল্পকারখানার যন্ত্র, কেমিক্যাল, বস্ত্র খাতের কাঁচামাল, ইলেকট্রনিক পণ্য ও আসবাব—সবকিছুর জন্যই বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের প্রথম পছন্দ এখন চীন। পোশাক তৈরির বেশির ভাগ কাঁচামালও আসে চীন থেকেই।

চীনের এই বাণিজ্যিক উত্থানের ফলে বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় এক গভীর নির্ভরশীলতা তৈরি হয়েছে। ২০২০ সালে কোভিড-১৯ মহামারির সময় চীনে কঠোর লকডাউন হলে তার প্রভাব পড়েছিল সারা বিশ্বে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রকেও মাস্কের মতো জরুরি পণ্যের জন্য চীনের ওপর নির্ভর করতে হয়েছিল। এই ঘটনা প্রমাণ করে, চীনের উৎপাদন ও রপ্তানি প্রক্রিয়ায় কোনো বিঘ্ন ঘটলে বিশ্বের প্রায় সব দেশের শিল্প ও সরবরাহব্যবস্থায় চাপ পড়বে।

চীন এখন শুধু বিশ্বের কারখানা নয়, উচ্চ প্রযুক্তির কেন্দ্র হয়ে ওঠার পথে। বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারে টেসলাকে পেছনে ফেলে চীনের বিওয়াইডি এখন শীর্ষে। সেমিকন্ডাক্টর ও ইলেকট্রনিক পণ্য তৈরির জন্য অপরিহার্য বিরল মৃত্তিকা খননের ৭০ শতাংশ, প্রক্রিয়াজাতকরণের ৯০ শতাংশ এবং চুম্বক তৈরির ৯৩ শতাংশই এখন চীনের নিয়ন্ত্রণে। সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের খবরে বলা হয়েছে, সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জামের পর এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প সরঞ্জামের দিকে ঝুঁকছে চীন। গোল্ডম্যান স্যাকসের বিশ্লেষকেরা বলছেন, চীন এখন 'গো গ্লোবাল ৩.০' যুগে প্রবেশ করেছে।

চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে রাজনৈতিক দূরত্ব বাড়লেও অর্থনৈতিক সম্পর্ক ভাঙা যাচ্ছে না। স্মার্টফোন, ব্যাটারি, সেমিকন্ডাক্টর, উড়োজাহাজ প্রযুক্তি ও জ্বালানিবাণিজ্যে দুই দেশ পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল। জাতিসংঘের বাণিজ্যবিষয়ক তথ্যভান্ডার ইউএন কমট্রেডের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র খেলনা ও ভিডিও গেমের কনসোল থেকে শুরু করে স্মার্টফোনের সরঞ্জাম—সব ক্ষেত্রেই চীনের ওপর নির্ভরশীল, আবার চীন উড়োজাহাজ প্রযুক্তি ও জ্বালানি রপ্তানিতে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল। এই পারস্পরিক নির্ভরতা আগামী দিনের বৈশ্বিক অর্থনীতির গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।