ইনডিড হায়ারিং ল্যাবের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী বছর থেকেই মার্কিন শ্রমশক্তি সংকুচিত হতে শুরু করবে। এই পূর্বাভাস বাস্তবায়িত হতে বেশি দিন লাগেনি। জুন মাসেই যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমশক্তি অংশগ্রহণের হার ৬১.৫ শতাংশে নেমে এসেছে। ১৯৭৬ সালের পর মহামারির বাইরে এটি সর্বনিম্ন হার। মাত্র এক মাসের ব্যবধানে ৭ লাখ ২০ হাজার মানুষ শ্রমবাজার ছেড়েছেন।

ইনডিড হায়ারিং ল্যাবের অর্থনীতি পরিচালক ও সাবেক রিচমন্ড ফেড অর্থনীতিবিদ লরা উলরিচ জানিয়েছেন, এই পতনকে নিরুৎসাহিত শ্রমিকদের আত্মসমর্পণ হিসেবে না দেখে বরং সরবরাহ সংকট হিসেবে দেখা উচিত। নিয়োগকর্তাদের চাহিদা মেটানোর মতো যথেষ্ট শ্রমিক এখন আর নেই। তিনি বলেন, ‘ঐতিহাসিকভাবে শুক্রবারের মতো কর্মসংখ্যার দিকে তাকিয়ে বলা যেত, “আমোদ-প্রমোদ ও আতিথেয়তা খাতে পতন হয়েছে, মানে ওই খাতে শ্রমিকের চাহিদা কমেছে।” কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, বরং শ্রম সরবরাহই এর কারণ হতে পারে। এক মাসে চাকরি না যোগ হওয়ার দুটি কারণ হতে পারে: হয় শ্রমিকের চাহিদা নেই, অথবা চাহিদা থাকলেও যথেষ্ট যোগান নেই।’

প্রতিবেদন অনুযায়ী, অভিবাসন নীতির পরিবর্তন ও বেবি বুমার প্রজন্মের দ্রুত অবসর গ্রহণ—এই দুই কারণে শ্রমশক্তি সংকুচিত হচ্ছে। ‘দ্য গ্রেট মিসম্যাচ: হাউ আ শ্রিঙ্কিং ওয়ার্কফোর্স, এআই, অ্যান্ড লেবার রিয়্যালোকেশন উইল ডিফাইন দ্য নেক্সট ১৫ ইয়ারস’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ থেকে ২০৩২ সালের মধ্যে শ্রমশক্তি প্রায় ৩ দশমিক ৭ শতাংশ বা ৫৯ লাখ শ্রমিক কমতে পারে। এরপর আংশিক পুনরুদ্ধার হবে। আরও আশঙ্কা করা হচ্ছে, ২০৪০ সালের মধ্যে বেকারত্বের হার ০.৫ থেকে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ পয়েন্ট বেড়ে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় প্রায় ৮ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।

উলরিচ জানান, প্রথমে যখন তারা এই সংখ্যা দেখেন, তখন তিনি নিজেই নিশ্চিত ছিলেন না। কিন্তু একই সময়ে তৎকালীন ফেড চেয়ার জেরোম পাওয়েল জানান, অর্থনীতিতে শ্রমশক্তির প্রবৃদ্ধি ‘খুবই খুবই কম, প্রায় নেই বললেই চলে।’ এটি দেখে উলরিচ বুঝতে পারেন যে জনমিতিক পরিবর্তন এবং বেবি বুমারদের কর্মবিয়োগের হারই এর পেছনে প্রধান কারণ।

শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিএলএস) দশবর্ষী পূর্বাভাসও অংশগ্রহণ হ্রাসের ইঙ্গিত দিচ্ছে। উলরিচের মতে, বর্তমান অভিবাসন বিধিনিষেধের আগেই এই পূর্বাভাস তৈরি করা হয়েছিল। ‘আগামী বছর যখন তাদের নতুন হিসাব বের হবে, তখন আরও তীব্র পতন দেখা যাবে, কারণ অভিবাসী শ্রমিকরা দেশি শ্রমিকদের তুলনায় কমবয়সী এবং তাদের শ্রমশক্তি অংশগ্রহণের হারও বেশি।’

বিএলএস-এর তথ্য অনুযায়ী, বিদেশি-জন্মানো শ্রমিকদের অংশগ্রহণের হার ৬৬ দশমিক ৩ শতাংশ, যেখানে দেশি শ্রমিকদের হার ৬১ দশমিক ৬ শতাংশ। পুরুষদের মধ্যে এই ব্যবধান আরও প্রকট: বিদেশি পুরুষদের হার ৭৬ দশমিক ৯ শতাংশ, দেশি পুরুষদের ৬৫ দশমিক ৮ শতাংশ। তবে নারীদের মধ্যে উল্টো চিত্র দেখা যায়। দেশি নারীদের অংশগ্রহণের হার অভিবাসী নারীদের চেয়ে বেশি, বিশেষ করে ছোট শিশু আছে এমন মায়েদের ক্ষেত্রে। বয়সের প্রভাবও রয়েছে: প্রায় ৭০ দশমিক ১ শতাংশ অভিবাসী মানুষের বয়স ২৫ থেকে ৫৪ বছরের মধ্যে, যা ‘প্রাইম-এইজ’ হিসেবে বিবেচিত। দেশি আমেরিকানদের মধ্যে এই হার ৬২ দশমিক ৭ শতাংশ।

উলরিচ বলেন, ‘অভিবাসন কমলে দুটি সম্পর্কিত প্রভাব পড়ে: অভিবাসী শ্রমিকরা কমবয়সী হওয়ায় কর্মশক্তি বয়স্ক হয়ে পড়ে, এবং একই বয়সগোষ্ঠীর মধ্যেও বিশেষ করে বিদেশি পুরুষদের অংশগ্রহণের হার বেশি।’

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলছে। এআই প্রযুক্তি তথ্য খাত, আর্থিক কার্যক্রম ও পেশাদার ব্যবসায়িক সেবা খাতে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই খাতগুলোর কর্মশক্তিই সবচেয়ে তরুণ এবং এসব খাতেই সবচেয়ে বেশি স্নাতক প্রবেশের চেষ্টা করছেন। প্রতিবেদনের সবচেয়ে এআই-বিধ্বংসী পরিস্থিতিতে, ২০২৫ সালে ৪ শতাংশ থাকা এই তিন খাতের সম্মিলিত বেকারত্ব ২০৩২ সালে বেড়ে ১২ শতাংশ হতে পারে। তথ্য খাতে তা ২১ দশমিক ২ শতাংশ, আর্থিক কার্যক্রমে ১১ দশমিক ৮ শতাংশ এবং পেশাদার ও ব্যবসায়িক সেবায় ১০ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।

উলরিচ বলেন, ‘লোকেরা ফিন্যান্স বা কম্পিউটার সায়েন্সে পড়তে যায় কারণ ঐতিহাসিকভাবে এগুলো সফল ক্যারিয়ার পথ। ফলে এই খাতগুলোতে মানুষের প্রবাহ অব্যাহত থাকে, কিন্তু আসলে এআই প্রথম এবং সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলছে এই খাতগুলোর ওপর।’

অন্যদিকে, সরকার, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও নির্মাণের মতো খাতে কর্মশক্তি দ্রুত বয়স্ক হচ্ছে এবং নতুন লোক আসছে না। প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এআই এই ব্যবধান কমাতে খুব বেশি ভূমিকা রাখছে না। স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে উলরিচ নিউ মেক্সিকোর উদাহরণ দেন, যেখানে ৩৯ দশমিক ২ শতাংশ চিকিৎসকের বয়স ৬০-এর ওপর। নার্সিং খাতেও জটিলতা রয়েছে: ৬৮ শতাংশ নার্স সরাসরি এই পেশায় এসেছেন এবং যারা নার্সিং ছেড়েছেন তাদের ৭২ শতাংশ একই পেশায় থেকে গেছেন। এটি প্রমাণ করে যে উচ্চ প্রশিক্ষণ ও সার্টিফিকেশন বাধা এই পেশাকে অন্যান্য শিল্পের শ্রমিকদের জন্য দুর্গম করে রেখেছে, যদিও চাহিদা প্রচুর।

গৃহস্থালি সাহায্যকারীর মতো কম মজুরি ও উচ্চ চাহিদাসম্পন্ন খাতে যোগানের ঘাটতি সবচেয়ে প্রকট। উলরিচের মতে, বয়স্ক জনগোষ্ঠীর কারণে চাহিদা বাড়লেও মজুরি বাড়েনি। ‘এটি একটি মিসম্যাচ সমস্যা। তত্ত্ব অনুযায়ী এআই ম্যাচিং সহজ করবে, কিন্তু এটি যে ঘর্ষণ তৈরি করে তা আমরা মনে করি কর্মসংস্থান কমিয়ে দেবে।’

তবে এআই এখনও পর্যন্ত মানুষের কাজ প্রতিস্থাপন করতে পারেনি বলে মন্তব্য করেন উলরিচ। ‘আমি বিশ্বাস করি না যে এখন অনেক এআই এজেন্ট এমন কাজ করছে যা মানুষ আগে করত। কিন্তু প্রতিষ্ঠানগুলোর মূলধন ব্যয় (ক্যাপেক্স) বৃদ্ধির বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত এবং ক্রয় সিদ্ধান্ত শ্রমকে প্রতিস্থাপন করছে। এটি এআই-এর একটি পরোক্ষ প্রভাব।’

ইনডিড তাদের মডেলে ২০৪০ সাল পর্যন্ত দুটি পরিস্থিতি তৈরি করেছে: একটি যেখানে এআই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক চাকরি ধ্বংস করে, অন্যটি যেখানে এটি মানুষের শ্রমকে সম্প্রসারিত করে এবং নতুন চাকরি সৃষ্টি করে। উলরিচ বলেন, ‘আমরা মডেলে এআই নিয়ে যা-ই করি না কেন, জনমিতিক পরিবর্তনই বড় গল্প।’

তিনি বেবি বুমারদের থেকে জেনারেশন এক্স এবং পুরনো মিলেনিয়ালদের কাছে সম্পদ হস্তান্তরের বিষয়টিও উল্লেখ করেন, যা ইনডিডের বর্তমান মডেলে ধরা হয়নি। ‘অর্থনৈতিক তত্ত্ব বলবে, এটি সেই লোকদের শ্রম সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলবে যারা এই স্থানান্তর পায়,’ তিনি বলেন, যার ফলে বুমারদের পরবর্তী প্রজন্মের অবসরের বয়স আরও কমতে পারে, বিশেষ করে সাদা-কলার কর্মীদের মধ্যে যারা সবচেয়ে বেশি উত্তরাধিকার পাবেন।

অংশগ্রহণ হ্রাসের কিছু অংশ হয়তো দুর্দশার চেয়ে স্বেচ্ছামূলক, যা আর্থিকভাবে সচ্ছল পরিবারগুলোর অনুভূতির সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। ফেডের জরিপ অনুযায়ী, গত তিন বছরে প্রায় ৭২-৭৩ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক বলেছেন তারা আর্থিকভাবে ঠিকঠাক আছেন—২০২১ সালে ৭৮ শতাংশের তুলনায় কম, কিন্তু জুন মাসের শ্রমশক্তি ত্যাগের পেছনে ব্যাপক অর্থনৈতিক হতাশার ইঙ্গিত দেয় না। তবে দ্রুত প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের বিষয়টি রয়েই গেছে। উলরিচ বলেন, ‘জনমিতিক পরিবর্তন ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের এই সময়ে একসঙ্গে থাকা অত্যন্ত মজার ব্যাপার।’