দক্ষিণ আমেরিকার মানচিত্রের দিকে তাকালে একটি বিশেষ বিষয় দৃষ্টি আকর্ষণ করে। মহাদেশের অধিকাংশ দেশেই মানুষের মুখের ভাষা স্প্যানিশ হলেও, বিশাল আয়তনের ব্রাজিলের রাষ্ট্রভাষা ও প্রধান ভাষা হলো পর্তুগিজ। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, কেন এই ভাষাগত ব্যতিক্রম? এর উত্তর খুঁজতে ফিরে যেতে হবে পাঁচ শতাব্দীরও বেশি সময় আগে, যেখানে জড়িয়ে আছে একজন পোপ, দুটি সামুদ্রিক পরাশক্তি ও একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি।
কলম্বাস ১৪৯২ সালে আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে ইউরোপীয়দের কাছে ‘নতুন বিশ্ব’ উন্মোচন করার পর স্পেন ও পর্তুগালের মধ্যে নতুন ভূখণ্ড দখলের তীব্র প্রতিযোগিতা শুরু হয়। সংঘাত এড়াতে স্পেনের অনুরোধে পোপ ষষ্ঠ আলেকজান্ডারের মধ্যস্থতায় ১৪৯৪ সালে স্বাক্ষরিত হয় টরডেসিলাস চুক্তি। এ চুক্তির মাধ্যমে আটলান্টিক মহাসাগরের ওপর একটি কাল্পনিক সীমারেখা টানা হয়। রেখার পশ্চিমের অঞ্চল স্পেনের এবং পূর্বের অংশ পর্তুগালের অধীনে থাকবে বলে স্থির করা হয়। পরবর্তী আলোচনায় সীমারেখাটি কিছুটা পশ্চিমে সরিয়ে নেওয়া হয়, যার ফলে ১৫০০ সালে নাবিক পেদ্রো আলভারেস ক্যাব্রাল বর্তমান ব্রাজিল উপকূলে পৌঁছালে পর্তুগাল আইনত সেই ভূখণ্ডের দাবি করতে সক্ষম হয়। চুক্তির এই পরিবর্তন না হলে আজকের ব্রাজিলও সম্ভবত স্প্যানিশভাষী দেশগুলোর অন্তর্ভুক্ত হতো।
প্রথম দিকে পর্তুগালের আগ্রহ খুব একটা ছিল না। কিন্তু ষোড়শ শতাব্দীতে ‘পাউ-ব্রাজিল’ বা ব্রাজিলউড নামের মূল্যবান লাল রং উৎপাদনকারী কাঠের সন্ধান মেলার পর অঞ্চলটির অর্থনৈতিক গুরুত্ব দ্রুত বেড়ে যায়। এই কাঠের নাম থেকেই ‘ব্রাজিল’ নামটির উৎপত্তি। এরপর শুরু হয় স্থায়ী বসতি স্থাপন, আখের চাষ এবং ধীরে ধীরে পর্তুগিজ প্রশাসন ও সংস্কৃতির বিস্তার। তবে ব্রাজিলের ইতিহাস নির্বিঘ্ন ছিল না। ১৫৫৫ সালে ফরাসিরা রিও ডি জেনিরো অঞ্চলে উপনিবেশ স্থাপনের চেষ্টা করলে কয়েক বছরের সংঘর্ষের পর ১৫৬০-এর দশকে পর্তুগিজরা সেই এলাকা পুনর্দখল করে। পরবর্তী সময়ে তারা দেশের অভ্যন্তরে আরও বিস্তৃত অঞ্চল অন্বেষণ ও দখল করে, যা আধুনিক ব্রাজিলের বিশাল ভৌগোলিক সীমানা গঠনে ভূমিকা রাখে।
প্রায় তিন শতাব্দী ধরে পর্তুগিজ উপনিবেশ হিসেবে ব্রাজিলে প্রশাসন, শিক্ষা, ধর্মীয় কর্মকাণ্ড ও বাণিজ্যের ভাষা ছিল পর্তুগিজ। ইউরোপীয় বসতি স্থাপনকারী, আফ্রিকা থেকে আনা দাস এবং স্থানীয় আদিবাসীদের মধ্যে দীর্ঘ মিথস্ক্রিয়ার ফলে বর্তমান ব্রাজিলীয় পর্তুগিজ গড়ে ওঠে। এটি পর্তুগালের পর্তুগিজ ভাষার মতো একই শিকড় থেকে উৎপন্ন হলেও উচ্চারণ, শব্দভান্ডার ও ব্যাকরণগত ব্যবহারে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে—ব্রিটিশ ও আমেরিকান ইংরেজির মতোই।
১৮২২ সালে ব্রাজিল পর্তুগালের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করলেও ভাষাগত উত্তরাধিকার অটুট থাকে। স্বাধীনতার পরও পর্তুগিজ রাষ্ট্রের প্রশাসনিক, শিক্ষাগত ও সাংস্কৃতিক ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি পর্তুগিজভাষী মানুষের বাস ব্রাজিলে, অর্থাৎ পর্তুগালের চেয়ে অনেক বেশি লোক সেখানে পর্তুগিজ ভাষায় কথা বলে।
এ কারণেই লাতিন আমেরিকার মানচিত্রে ব্রাজিল একটি অনন্য ব্যতিক্রম। মেক্সিকো থেকে আর্জেন্টিনা, চিলি, পেরু, কলম্বিয়া ও উরুগুয়ে—অধিকাংশ দেশের সরকারি ভাষা স্প্যানিশ, কারণ এগুলো ছিল স্পেনের উপনিবেশ। অন্যদিকে ব্রাজিল ছিল পর্তুগালের উপনিবেশ, তাই সেখানকার মানুষের ভাষা পর্তুগিজ। একটি সীমারেখা, একটি কূটনৈতিক চুক্তি এবং কয়েক শতাব্দীর উপনিবেশিক ইতিহাস—এই তিনটি বিষয় ব্রাজিলের ভাষাগত পরিচয় নির্ধারণ করেছে। এটি শুধু ভাষার ইতিহাস নয়, বিশ্বরাজনীতি, উপনিবেশবাদ ও ইতিহাসের এক দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবের জীবন্ত সাক্ষ্য।




