রাজধানীর সবুজবাগ এলাকায় ওয়ার্ড বিএনপির সক্রিয় কর্মী ইব্রাহীম পলাশকে (৩২) কুপিয়ে হত্যার ঘটনার মূল রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ। সংস্থাটি জানিয়েছে, ইব্রাহীমের মা-বাবাকে পূর্বে মারধরের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্যই প্রধান অভিযুক্ত মোস্তফা হোসেন রয়েল তাঁর দুই হাত বিচ্ছিন্ন করার পরিকল্পনা করেন। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী, সহযোগীদের নিয়ে দেশীয় অস্ত্র দিয়ে অতর্কিতে আক্রমণ চালায় মোস্তফা, যার ফলে ঘটনাস্থলেই ইব্রাহীম মৃত্যুবরণ করেন। এই মামলায় মোস্তফাসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। এর আগে গত ২১ জুলাই রাত সোয়া আটটার দিকে সবুজবাগের বাগপাড়া এলাকায় পানির পাম্পের পাশে অবস্থিত সোহাগের চায়ের দোকানের সামনে এই হামলার ঘটনা ঘটে। ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে ইব্রাহীমকে গুরুতর জখম করা হয়। হামলায় তাঁর উভয় হাতের কবজি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং বুকে আঘাত করা হয়। রক্তাক্ত অবস্থায় তাঁকে প্রথমে মুগদা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানকার চিকিৎসকরা তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করলে জরুরি বিভাগের চিকিৎসক রাত সাড়ে ৯টায় তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
পরে এই ঘটনায় ইব্রাহীমের বড় বোন বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেন। নিহত ইব্রাহীম লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার সোনাপুর এলাকার আবুল বাশারের ছেলে। পেশায় তিনি প্রাইভেট কার চালক ছিলেন এবং সবুজবাগের ৭১ নম্বর মাদারটেক এলাকায় বসবাস করতেন। তিনি সবুজবাগের ৫ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির একজন কর্মী হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
হত্যাকাণ্ডের পরের দিনই মো. নাঈম নামের একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে ২৭ জুলাই গ্রেপ্তার হন মো. আলী নামের আরেকজন। পুলিশের ধারাবাহিক অভিযান ও গোয়েন্দা তৎপরতার মুখে ২৬ জুলাই প্রধান অভিযুক্ত মোস্তফা হোসেন ও তাঁর সহযোগী মো. সবুজ আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। ডিএমপির মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ জানান, এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার চারজনই আদালতে অপরাধ স্বীকার করেছেন। অন্যান্য আসামিদেরও শনাক্ত করা হয়েছে এবং দ্রুতই তাদের গ্রেপ্তার করা হবে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, নিহত ইব্রাহীম ও আসামি মোস্তফা পূর্বপরিচিত ছিলেন। দুজনই স্থানীয় রাজনীতির সাথে জড়িত। মোস্তফা সবুজবাগের ৫ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক এবং হত্যাকাণ্ডে জড়িত অন্যরা তাঁর কর্মী। তবে এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে কোনো রাজনৈতিক বিরোধ ছিল না বলে দাবি করছে পুলিশ। ইব্রাহীম স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন সালিস-বিচারের সাথে জড়িত ছিলেন। হত্যার আগেও তিনি ওই গলিতে একটি সালিসে অংশ নিচ্ছিলেন এবং সালিস শেষে সেখানেই তাঁকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
হত্যার কারণ সম্পর্কে আসামিদের বরাত দিয়ে পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার কয়েক দিন আগে মোস্তফার সহযোগী সবুজের ভাগনে তানভীর স্থানীয় একটি রিকশা গ্যারেজে প্রস্রাব করলে গ্যারেজ ম্যানেজার তাকে মারধর করে। এর জেরে সবুজ পুনরায় ম্যানেজারকে মারধর করে। বিষয়টি নিয়ে গ্যারেজ মালিক মো. রসুল ইব্রাহীমের কাছে বিচার দেন। বিচার করতে গিয়ে ইব্রাহীম লোকজন নিয়ে সবুজকে ধাওয়া দেয়। মারধর থেকে বাঁচতে সবুজ মোস্তফার বাসায় আশ্রয় নেয় এবং দেয়াল টপকে পালিয়ে যায়। পরে এ নিয়ে ইব্রাহীমের সাথে মোস্তফার বাগবিতণ্ডা হয় এবং ইব্রাহীম মোস্তফা ও তাঁর মা-বাবাকে মারধর করে। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে মোস্তফা প্রতিশোধ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
জিজ্ঞাসাবাদের তথ্য অনুযায়ী, মোস্তফা তাঁর সহযোগীদের নিয়ে ইব্রাহীমের দুই হাত বিচ্ছিন্ন করার পরিকল্পনা করেন এবং ২১ জুলাই সন্ধ্যায় দেশীয় ধারালো অস্ত্র নিয়ে অতর্কিত আক্রমণ চালান। তাঁরা ইব্রাহীমকে কুপিয়ে গুরুতর আহত করে হাত কেটে নিয়ে যায়। তবে আসামিরা দাবি করছে, তাঁদের উদ্দেশ্য ইব্রাহীমকে হত্যা করা ছিল না। পুলিশ জানিয়েছে, বিচ্ছিন্ন হাত পাশের একটি ফাঁকা প্লটের জমে থাকা পানিতে ফেলে দেয়া হয়। সেখান থেকে ইব্রাহীমের ডান হাতের কবজিসহ অংশ উদ্ধার করা হয়েছে এবং ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য সিআইডিতে পাঠানো হয়েছে। তবে বাঁ হাত এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
ডিএমপির মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার আরও জানান, ইব্রাহীম ও মোস্তফা উভয়ের বিরুদ্ধেই সবুজবাগ থানায় একাধিক মামলা রয়েছে। মোস্তফার বিরুদ্ধে চুরি, চাঁদাবাজি, মারধর ও হত্যার হুমকির অভিযোগে সাতটি মামলা আছে। অপরদিকে ইব্রাহীমের বিরুদ্ধেও হত্যাচেষ্টার মামলা রয়েছে।




