বৈশ্বিক ক্রিপ্টোকারেন্সি বাজারের মন্দাভাব এবার সরাসরি আঘাত হেনেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মিডিয়া প্রতিষ্ঠানটিতেও। ট্রুথ সোশ্যাল ও প্রেডিকশন মার্কেট প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ প্রেডিক্টের মূল প্রতিষ্ঠান ট্রাম্প মিডিয়া অ্যান্ড টেকনোলজি গ্রুপ চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকের আর্থিক প্রতিবেদনে ২৩৮ মিলিয়ন ডলারের বিশাল লোকসানের কথা প্রকাশ করেছে। প্রতিষ্ঠানটির সবশেষ কোয়ার্টারলি রিপোর্ট অনুযায়ী, এই লোকসানের ১৯০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি এসেছে বিটকয়েন, অন্যান্য ডিজিটাল সম্পদ এবং স্টক হোল্ডিংয়ের মূল্য হ্রাসের কারণে — যার অর্থ হলো, ক্রিপ্টো বাজার ঘুরে দাঁড়ালে এই কাগজে-কলমে হওয়া ক্ষতি পুনরুদ্ধার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
২০২২ সালে ট্রুথ সোশ্যালের মূল কর্পোরেট সত্তা হিসেবে যাত্রা শুরু করা ট্রাম্প মিডিয়া ২০২৫ সালে বিটকয়েন ও অন্যান্য ডিজিটাল সম্পদের রেকর্ড মূল্য দেখে ক্রিপ্টো-কেন্দ্রিক হোল্ডিং কোম্পানিতে রূপ নেয়। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে সিঙ্গাপুরভিত্তিক ক্রিপ্টো ডট কমের সাথে অংশীদারত্ব গড়ে তোলে তারা, যার লক্ষ্য ছিল ডিজিটাল-সম্পদ কৌশল আরও শক্তিশালী করা। জুন মাস শেষে ট্রাম্প মিডিয়ার হাতে ছিল প্রায় ৯ হাজার ৪৭৭ বিটকয়েন, যার আনুমানিক মূল্য ৫৫৭ মিলিয়ন ডলার। একইসাথে ক্রিপ্টো ডট কমের ক্রোনোস ব্লকচেইনের সাথে যুক্ত ৭৫৬ মিলিয়নেরও বেশি ক্রোনোস টোকেনও ছিল তাদের দখলে, যার বাজারমূল্য ছিল প্রায় ৪০ মিলিয়ন ডলার।
কিন্তু সম্প্রতি বিটকয়েনের দর ব্যাপকভাবে পতন ঘটেছে। ১২৬ হাজার ডলারের সর্বোচ্চ স্তর থেকে বিটকয়েন ৪৬ শতাংশের বেশি কমে এখন ৬৩ হাজার ৫০০ ডলারের কাছাকাছি লেনদেন হচ্ছে। অন্যদিকে ক্রোনোস টোকেনের দর গত এক বছরে প্রায় ৭২ শতাংশ কমে ৫ সেন্টের ঘরে নেমে এসেছে। ফলে ট্রাম্প মিডিয়ার সম্পদের পোর্টফোলিওতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। অ্যাক্সিওসের খবর অনুযায়ী, এই পরিস্থিতিতে ক্রিপ্টো ডট কমের সাথে অংশীদারত্বের কিছু অংশ কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ট্রাম্প মিডিয়া। এমনকি ক্রোনোস টোকেনের ভান্ডার গড়ে তোলা এবং সেগুলো স্টেক করে আয় করার জন্য আলাদা পাবলিকলি ট্রেডেড কোম্পানি তৈরির পরিকল্পনাও বাতিল করা হয়েছে।
এই লোকসান শুধু ট্রাম্প মিডিয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বিপুল পরিমাণ ক্রিপ্টোকারেন্সি নিজেদের ব্যালেন্স শিটে ধারণ করা অন্যান্য কোম্পানিও একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে। বিশ্বের বৃহত্তম কর্পোরেট বিটকয়েন ধারক স্ট্র্যাটেজির শেয়ার ৭৬ শতাংশ পতন ঘটেছে এবং জুন মাস থেকে তারা প্রায় ৪৩০ মিলিয়ন ডলারের বিটকয়েন বিক্রি করেছে।
ক্রিপ্টো ক্ষতি ছাড়াও ট্রাম্প মিডিয়ার লোকসানের আরও কিছু কারণ রয়েছে। ২০২৪ সালে ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড অ্যাকুইজিশন কর্পোরেশনের সাথে একীভূত হওয়ার পর প্রাক্তন অংশীদার ও নির্বাহীদের মালিকানা নিয়ে আইনি জটিলতার কারণে ২৫.৬ মিলিয়ন ডলার আইনি ব্যয় হয়েছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে পরিচালন ব্যয়ের জন্য ১৩.৭ মিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে।
তবে এই লোকসানের মধ্যেও কিছু ইতিবাচক দিক দেখছে প্রতিষ্ঠানটি। সিইও কেভিন ম্যাকগার্নের নেতৃত্বে ট্রাম্প মিডিয়ার আয় আগের বছরের তুলনায় ৮৯ শতাংশ বেড়ে ১.৭ মিলিয়ন ডলার হয়েছে। ট্রুথ+ স্ট্রিমিং সার্ভিসের বাণিজ্যিক লঞ্চ এবং ট্রুথ.এফআই এক্সচেঞ্জ-ট্রেডেড ফান্ডের ম্যানেজমেন্ট ফি এই আয় বৃদ্ধিতে সহায়তা করেছে। প্রতিষ্ঠানটির ১.৯ বিলিয়ন ডলারের বেশি লিকুইড আর্থিক সম্পদ রয়েছে, যা বর্তমান পরিচালন ব্যয় মেটানোর জন্য যথেষ্ট সুরক্ষা দেবে। এছাড়াও আগের একীভবন সংক্রান্ত বেশিরভাগ আইনি বিরোধ মীমাংসা হয়ে গেছে বলেও জানানো হয়েছে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ট্রাম্প মিডিয়া এনার্জি-সিকিউরিটি অবকাঠামো কোম্পানি টিএই টেকনোলজিসের সাথে চতুর্থ প্রান্তিকে একীভূত হওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। পাশাপাশি বিটকয়েন ট্রেজারি কৌশল পরিবর্তন করে অপশনসহ অন্যান্য আর্থিক উপকরণ ব্যবহারের মাধ্যমে অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা করছে তারা। ট্রুথ অ্যাপিআই সার্ভিসের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক গ্রাহকদের প্ল্যাটফর্ম ডেটা বিক্রি করে আয় বাড়ানোরও পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।




