শুক্রবার দুপুরে ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবনের একটি আকস্মিক বিজ্ঞপ্তি এবং তার অল্প সময়ের মধ্যে প্রত্যাহার কূটনৈতিক মহলে ব্যাপক বিস্ময় ও জল্পনার জন্ম দেয়। বেলা দুইটা তেরো মিনিটে রাষ্ট্রপতির ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি নাভিকা গুপ্ত একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানান যে শনিবারের ‘চেঞ্জ অব গার্ড’ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে না। কারণ হিসেবে বলা হয়, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে আনুষ্ঠানিকভাবে অভ্যর্থনা জানানোর প্রস্তুতির জন্য ওই সময় পূর্ণ রিহার্সাল চলবে। প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরোও (পিআইবি) একই বার্তা প্রচার করে। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে থমকে থাকা সফর নিয়ে নতুন করে গুঞ্জন শুরু হয় এবং গণমাধ্যম সক্রিয় হয়ে ওঠে।

কিন্তু কিছুক্ষণ পরই পরিস্থিতির মোড় ঘুরে যায়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্পষ্ট করে জানায়, ওই ঘোষণা সঠিক নয়। পিআইবির ওয়েবসাইট থেকে বিজ্ঞপ্তিটি সরিয়ে ফেলা হয়। বেলা তিনটা বত্রিশ মিনিটে নাভিকা গুপ্ত পুনরায় জানান যে আগের ঘোষণা প্রত্যাহার করা হয়েছে। কোথাও কোনো ভুল হয়েছে তা স্পষ্ট হলেও, কার দায়িত্বে এবং কীভাবে এমন বিভ্রান্তি তৈরি হলো—সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা রয়ে গেছে।

এই ঘটনার পেছনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের সম্ভাবনা নিয়ে চলমান আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কয়েকদিন ধরে দুই দেশের কূটনৈতিক মহল সরগরম ছিল। প্রথমে ধারণা করা হচ্ছিল, ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের আউটরিচে বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে যোগদানের আগেই তারেক রহমান দ্বিপক্ষীয় সফরে ভারতে আসতে পারেন। তবে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ভারতে আশ্রিত দণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভবিষ্যৎ আচরণ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলা এবং কিছু শর্ত আরোপের পর সফর ঘিরে আলোচনা কিছুটা স্তিমিত হয়ে পড়ে। ঠিক সেই সময়েই রাষ্ট্রপতি ভবনের এই ঘোষণা আসে।

বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সফরটি চূড়ান্ত বলে ধরে নেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর দিল্লি সফরের পর সেই ধারণা আরও দৃঢ় হয়। সে অনুযায়ী ২২ আগস্ট শনিবারের সামরিক অনুষ্ঠান বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ২৪ তারিখে হায়দরাবাদ হাউসে নৈশভোজের আয়োজনও প্রায় নিশ্চিত ছিল বলে শোনা যায়। অনেকের কাছে আমন্ত্রণপত্রও পাঠানো হয়েছিল বলে বিভিন্ন মহলে খবর রয়েছে, যদিও সরকারিভাবে এসবের কোনো নিশ্চিতকরণ মেলেনি। তবু প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে, এত বড় ভুল কীভাবে ঘটল এবং এর জন্য কে দায়ী।

রাষ্ট্রপতি ভবনের ‘চেঞ্জ অব গার্ড’ অনুষ্ঠান সামরিক বাহিনীর একটি ঐতিহ্যবাহী রীতি। প্রতি শনিবার সকালে রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুরোনো রক্ষীরা নতুন বাহিনীর কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করেন। ঘোড়সওয়ার বাহিনীর কুচকাওয়াজ, সামরিক ব্যান্ডের সুর এবং সর্বসাধারণের জন্য টিকিট বিক্রির ব্যবস্থা—সব মিলিয়ে প্রায় পঞ্চাশ মিনিটের এই দৃষ্টিনন্দন অনুষ্ঠান মোরাম বিছানো প্রশস্ত আঙিনায় অনুষ্ঠিত হয়।

অন্যদিকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল শুক্রবারের ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সফর বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে বলেন, এ ধরনের কোনো খবর থাকলে তা জানানো হবে। তার বক্তব্যে স্পষ্ট যে চলতি মাসে দ্বিপক্ষীয় সফরের যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, তা আপাতত ফলপ্রসূ হচ্ছে না। তবু দুই দেশের ওয়াকিবহাল মহলের মতে, সরকারি পর্যায়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।

ঢাকার কূটনৈতিক সূত্রগুলো প্রথম আলোকে জানিয়েছে, ভারতের গণমাধ্যমে প্রকাশিত আগামী সপ্তাহের সফরের খবর সঠিক নয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্রগুলোর মতে, প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য দিল্লি সফরের প্রস্তুতির জন্য কোনো দিকনির্দেশনা নেই। ফলে সফরের কোনো প্রস্তুতির সুযোগও নেই। তবে সরকারের একাধিক সূত্র সন্ধ্যায় জানিয়েছে, রাজনৈতিক স্তরের নির্দেশনায় দুই দেশের মধ্যে আলোচনা এখনো চলছে। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী রয়টার্সকে বলেছেন, সফর নিয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়নি। তিনি আরও যোগ করেন, শেখ হাসিনা ও অন্যান্য পলাতক অপরাধীদের প্রত্যর্পণের বিষয়ে ভারতের জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে ঢাকা।