জুলাই মাসে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে সেই স্বস্তি নেই বলে জানাচ্ছেন ক্রেতারা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে নেমেছে, আর খাদ্য মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ১৬ শতাংশে। তবে রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, চাল ছাড়া প্রায় সব ধরনের পণ্যের দামই গত বছরের একই সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।

রাজধানীর লালমাটিয়ার বাসিন্দা নওরীন জাহান মোহাম্মদপুর টাউন হল বাজার থেকে পাঁচ কেজি চাল, দুই লিটার সয়াবিন তেল, দেড় কেজি ব্রয়লার মুরগি, এক ডজন ডিম ও পাঁচ ধরনের সবজি কিনতে খরচ করেছেন ১ হাজার ১৭৫ টাকা। তাঁর ভাষ্য, এক বছর আগে এই একই বাজার থেকে পণ্যগুলো তিনি ৯০০ থেকে ৯৫০ টাকার মধ্যে কিনতে পারতেন। তিনি জানান, এই এক বছরে চালের দাম তেমন না বাড়লেও অন্যান্য সব পণ্যের দামই বেড়েছে। বেসরকারি চাকরিজীবী এই নারী বলেন, বাজারের এই বাড়তি দামের সঙ্গে তাঁর বেতন নিয়ে আর সংসার চালানো সম্ভব হচ্ছে না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মূল্যস্ফীতির এই সরকারি হিসাবের সঙ্গে বাজার-বাস্তবতার একটি অসংগতি রয়েছে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, যেসব ব্যক্তি নিয়মিত বাজারে যান, তাঁদের অনেকের কাছেই মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যানের সঙ্গে বাজারের প্রকৃত চিত্র মেলানো যায় না। তাঁর মতে, পরিসংখ্যানে যে চিত্র তুলে ধরা হয়, বাজারে গিয়ে তার প্রতিফলন পাওয়া যায় না। তিনি আরও উল্লেখ করেন, যতদিন প্রয়োজনীয় সংস্কার না হবে, ততদিন তথ্য-উপাত্তের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে। মূল্যস্ফীতি গণনায় আগের মতো রাজনৈতিক প্রভাব না থাকলেও কাঠামোগত কিছু সমস্যা এখনো রয়ে গেছে বলে মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ।

বিবিএসের হিসাব অনুযায়ী, গত জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতির হার ৮ দশমিক ৩২ শতাংশের বিপরীতে গড় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ২২ শতাংশ। অর্থাৎ মজুরি যে হারে বেড়েছে, মূল্যস্ফীতি তার চেয়েও বেশি ছিল। টানা ৫৩ মাস ধরে মজুরি বৃদ্ধির হারের চেয়ে মূল্যস্ফীতির হার বেশি থাকায় সীমিত আয়ের মানুষকে জীবনযাত্রার খরচ মেটাতে সঞ্চয় ভাঙতে হচ্ছে, অনেকে আবার ধারদেনার পথ বেছে নিচ্ছেন। অনেক পরিবার খাবার, পোশাক, যাতায়াতসহ বিভিন্ন খাতে খরচ কাটছাঁট করতে বাধ্য হচ্ছেন।

ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাব বলছে, গত বছরের জুলাইয়ের তুলনায় এ বছর জুলাইয়ে ১০ ধরনের নিত্যপণ্যের মধ্যে চাল ছাড়া বাকি সব পণ্যের দামই বেড়েছে। খোলা সয়াবিন তেলের দাম প্রায় ১৫ শতাংশ, বোতলজাত তেল ৬ শতাংশ এবং খোলা পাম তেল ১০ শতাংশ বেড়েছে। খোলা সয়াবিন তেলের লিটার এখন ১৮৬ থেকে ১৯৫ টাকা, আর বোতলজাত তেল বিক্রি হচ্ছে ১৯৯ টাকা লিটার। এক বছরের ব্যবধানে মসুর ডালের দামও কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা বেড়েছে। গত জুলাইয়ে ব্রয়লার মুরগির দাম ছিল ২০০ টাকার কাছাকাছি, যদিও গত বছরের একই সময়ে এই দাম ছিল ১৪০ থেকে ১৫০ টাকার মধ্যে। ডিমের দামও ডজনে ১৫ টাকা বেড়ে এখন ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা। মাছের বাজারেও একই চিত্র; রুই, তেলাপিয়া, পাঙাশসহ বিভিন্ন মাছের দাম কেজিতে ২০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।

গত মাসে দেশের বেশ কয়েকটি জেলায় বন্যার কারণে সবজির বাজারে চাপ সৃষ্টি হয়। খেত তলিয়ে যাওয়ায় অনেক সবজির দাম ১০০ টাকার উপরে উঠে গিয়েছিল এবং কাঁচা মরিচের কেজি ৪০০ টাকা ছাড়িয়ে যায়। সম্প্রতি সরবরাহ কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ায় সবজির দাম কিছুটা কমেছে। এর আগে তীব্র তাপপ্রবাহে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল মুরগির খামারগুলো। এছাড়া জ্বালানি তেল, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বৃদ্ধিতে বেড়েছে পণ্য পরিবহন ও উৎপাদন খরচ, যা বাজারে পণ্যের দামের ওপর প্রভাব ফেলেছে।

মূল্যস্ফীতি কমার কারণ হিসেবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, জুলাই মাসে চাল ও মাংসের দাম কমায় সার্বিক মূল্যস্ফীতি কিছুটা নেমেছে এবং এই তথ্য যাচাই করা হয়েছে। তবে মূল্যস্ফীতি কমার অর্থ এই নয় যে পণ্যের দাম কমেছে; বরং দাম বৃদ্ধির গতি কিছুটা শ্লথ হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে ১০০ টাকার পণ্য কিনতে এখন খরচ হচ্ছে ১০৮ টাকা ৩২ পয়সা, যা মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ক্রমশ বাড়তি চাপ তৈরি করছে।