যশোর ও খুলনার প্রাকৃতিক খাল-বিলের কুঁচিয়া বর্তমানে চীন, তাইওয়ানসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে। এই বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে যশোরের অভয়নগর, মনিরামপুর ও চৌগাছা উপজেলায় এবং খুলনা-বাগেরহাট অঞ্চলে লাখো মানুষ কুঁচিয়া শিকার ও ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন। তাঁদের অনেকেই ইতিমধ্যে দারিদ্র্যসীমা অতিক্রম করে আর্থিক সচ্ছলতা অর্জন করেছেন।

মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জীবন্ত কুঁচিয়ার রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৮ হাজার ৪০৮ মেট্রিক টন, যার বাজারমূল্য ৩৯৮ কোটি টাকা। এর আগের অর্থবছরে (২০২৩-২৪) রপ্তানি হয়েছিল ১৭ হাজার ৪৩৮ মেট্রিক টন, যার মূল্য দাঁড়ায় ৯৯৩ কোটি ৭১ লাখ টাকা। এছাড়া ২০২২–২৩ অর্থবছরে ১২ হাজার ১০৮ মেট্রিক টন কুঁচিয়া রপ্তানি করে ৬২০ কোটি টাকা আয় হয়।

রপ্তানিকারক বাবুল সরকার জানান, ঢাকা থেকে নিয়মিত বিমানযোগে চীন ও তাইওয়ানে কুঁচিয়া পাঠানো হয়। তবে দেশে এখনো কুঁচিয়ার বাণিজ্যিক চাষাবাদ সফল না হওয়ায় পুরো ব্যবসাটি প্রাকৃতিক উৎসের ওপর নির্ভরশীল। তাঁর মতে, এটি একটি সম্ভাবনাময় কৃষিপণ্য, যার আন্তর্জাতিক বাজার কয়েক শ কোটি টাকার।

অভয়নগরের কচুয়া গ্রামের বাসিন্দা কুমার বৈরাগী সাত বছর আগে মাত্র ১০ হাজার টাকা পুঁজি দিয়ে কুঁচিয়ার ব্যবসা শুরু করেন। পূর্বে তিনি কুঁচিয়া শিকার করে স্থানীয় হাটবাজারে বিক্রি করতেন। বর্তমানে তাঁর বাড়িতে একটি সংরক্ষণ হাউস গড়ে উঠেছে, যেখানে কুঁচিয়া জড়ো করে খুলনার রূপসা ও ঢাকার কাঁকড়া-কুঁচিয়ার আড়তে সরবরাহ করেন। পাশাপাশি তিনি কুঁচিয়া প্রক্রিয়াজাত করে রান্নার উপযোগী করেও বাজারজাত করেন। কুমার বৈরাগী জানান, গত অর্থবছরে তিনি ১০০টি চালানে ১০ হাজার কেজি কুঁচিয়া পাইকারি বিক্রি করে খরচ বাদে তিন লাখ টাকার বেশি লাভ করেছেন। টানা পাঁচ বছর লাভজনক ব্যবসার সুবাদে তিনি বসতভিটার সাত শতক জমির সাথে আরও সাত শতক জমি কিনেছেন এবং প্রায় ১০ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি আধা পাকা বাড়ি নির্মাণ করছেন।

৪৫ বছর বয়সী এই ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তাঁর বড় ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে আশপাশের অন্তত ৩০টি গ্রাম থেকে জীবিত কুঁচিয়া সংগ্রহ করে সংরক্ষণ হাউসে রাখেন। পরবর্তীতে সুবিধাজনক সময়ে খুলনার রূপসা এলাকায় মৃণাল কান্তি দের আড়তে পাঠান। চাহিদা অনুযায়ী কুঁচিয়া কেটে রান্নার উপযোগী করেও বিক্রি করেন। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা নবলোক পরিষদ গত বছর তাঁর বাড়ির আঙিনায় বিনা মূল্যে সংরক্ষণ হাউস নির্মাণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ উপকরণ ও প্রশিক্ষণ প্রদান করে। সংস্থাটির মৎস্য কর্মকর্তা তরুণ কুমার মোস্তফী জানান, পল্লী কর্ম–সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) সহায়তায় পরিচালিত একটি কর্মসূচির আওতায় কুমার বৈরাগীকে স্বাস্থ্যসম্মত সংরক্ষণ ও পানির নিয়মিত পরিবর্তনের কলাকৌশল শেখানো হয়, যার ফলে গত মৌসুমে তাঁর ব্যবসা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। পর্যায়ক্রমে অন্যদেরও একই সহায়তা দেওয়া হবে।

খুলনার রূপসা এলাকায় অবস্থিত নিউ মামা এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মৃণাল কান্তি দে জানান, যশোরের অভয়নগর-মনিরামপুর, খুলনার তেরখাদা ও বাগেরহাটের চিতলমারি থেকে কুঁচিয়া তাঁর আড়তে আসে। সেখান থেকে ঢাকার রপ্তানিকারকদের নিকট বিক্রির পর সেগুলো জীবন্ত অবস্থায় চীন, তাইওয়ানসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয়। তিনি গত বছর ১৫০ মেট্রিক টন কুঁচিয়া ঢাকায় পাঠিয়েছেন। তাঁর ভাই প্রশান্ত কুমার দে ও বাবুল সরকার কুঁচিয়ার বড় রপ্তানিকারক হিসেবে পরিচিত।

যশোর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মনিরুল মামুন কুঁচিয়াকে একটি অপ্রচলিত কিন্তু বিদেশে চাহিদাসম্পন্ন কৃষিপণ্য হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি জানান, একটি প্রকল্পের আওতায় মনিরামপুর ও অভয়নগরসহ বিভিন্ন মাছের বাজারে কুঁচিয়া বিক্রয়কেন্দ্র গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যাতে মৎস্যজীবীরা সহজেই কেনাবেচা করতে পারেন।