দেশজুড়ে হামের থাবায় শিশুমৃত্যুর মিছিল থামার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় (শনিবার সকাল ৮টা থেকে রোববার সকাল ৮টা) হামের উপসর্গ নিয়ে আরও সাত শিশুর প্রাণহানি ঘটেছে। একই সময়ে এই রোগের উপসর্গ দেখিয়ে নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে ৯২৫ শিশু, আর হাম শনাক্ত হয়েছে ১০৬ জনের দেহে।
রোববার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাম-সংক্রান্ত নিয়মিত প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সদ্যমৃত সাত শিশুর মধ্যে চারজনের মৃত্যুই হয়েছে রাজধানী ঢাকায়। এছাড়া সিলেট বিভাগে এক শিশু, এবং বরিশাল ও খুলনা বিভাগে একজন করে মোট দুই শিশুর মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে। এই তাজা পরিসংখ্যানের ফলে গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হাম ও এর উপসর্গের কারণে সর্বমোট প্রাণহানির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৩৮-এ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গযুক্ত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছে ৬৪৫ শিশু। অন্যদিকে, হাম শনাক্ত হওয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে ৯৩ জন। চলতি বছরের মার্চের মাঝামাঝি থেকে এ পর্যন্ত হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে মোট ১ লাখ ৫ হাজার ৬১৮ শিশুর মধ্যে। পরীক্ষার মাধ্যমে এদের মধ্যে হাম নিশ্চিত হয়েছে ১২ হাজার ৬৩২ জনের। অর্থাৎ, উপসর্গ ও শনাক্ত— উভয় মিলিয়ে মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৮ হাজার ২৫০-তে। এই সময়কালে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে ৮৮ হাজার ৮৪৪ শিশুকে, আর সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৮৫ হাজার ১২২ জন।
বিশেষজ্ঞ মহল ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এই ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে টিকাদান কার্যক্রমে চরম অবহেলাকে দায়ী করছে। চলতি বছরের গোড়ায় রোগটির প্রাদুর্ভাব শুরু হলেও তখন তা মোকাবিলায় কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। অথচ বাংলাদেশ ছিল টিকাদানের এক সফল উদাহরণ, যেখানে গত প্রায় সাত বছরে কোনো বছরই হামের সংক্রমণ চারশর বেশি হয়নি, আর মৃত্যুর ঘটনা তো ছিলই না। এই সাফল্যের পেছনে ছিল নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি।
ইউনিসেফ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তাদের একাধিক প্রতিবেদনে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে হামের টিকা প্রদানে অবহেলার কথা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে। ইউনিসেফের ভারপ্রাপ্ত বাংলাদেশ প্রতিনিধি স্ট্যানলি গুয়াভুইয়া গত মে মাসে এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, হাম নিয়ে তারা সরকারকে আগেই সতর্ক করেছিল। পরিস্থিতির চাপে গত ৫ এপ্রিল থেকে দেশের ৩০টি স্থানে সীমিত আকারে টিকাদান শুরু হয় এবং ১৫ এপ্রিল থেকে তা সারা দেশে সম্প্রসারিত করা হয়। কিন্তু এই উদ্যোগ সত্ত্বেও রোগের প্রকোপ ও মৃত্যু কোনোটাই কমেনি। জনস্বাস্থ্যবিদরা প্রাদুর্ভাব শুরুর পর থেকেই একে স্বাস্থ্যগত জরুরি অবস্থা ঘোষণার দাবি জানিয়ে এলেও সরকার সেই আহ্বানে সাড়া দেয়নি।
উদ্বেগের আরেকটি বড় কারণ হলো টিকাদান কর্মসূচিতে বিশাল ঘাটতি। সরকারের চলমান হাম-রুবেলা টিকাদান অভিযানে সম্প্রতি ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইনের আওতায় আসা শিশুদের তুলনায় প্রায় ৪০ লাখ শিশু কম টিকা পেয়েছে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এই সুবিশাল ঘাটতি দেশে হামের সংক্রমণ অব্যাহত থাকার একটি অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।




