দীর্ঘস্থায়ী বৃষ্টিপাতের জেরে চট্টগ্রামে এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। চলতি জুলাই মাসের প্রথম ১৩ দিনেই নগরের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন অন্তত ১৬৪ জন রোগী, যা এ বছর এখন পর্যন্ত মোট আক্রান্তের ৩৫ শতাংশ। গড়ে প্রতিদিন ১২ জন করে নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। গত ২৪ ঘণ্টায় (সোমবার সকাল পর্যন্ত) নতুন করে ভর্তি হয়েছেন ১৯ জন, বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৫৮ জন।
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্যানুযায়ী, সাধারণত জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত পাঁচ মাসে সারাবছরের ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে আসেন। ২০২৫ সালে এই পাঁচ মাসে ভর্তি হয়েছিলেন ৪ হাজার ৬৭ জন, যেখানে পুরো বছরে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৪ হাজার ৮৪৬। মৃত্যুর ক্ষেত্রেও একই ধারা পরিলক্ষিত হয়। এ বছর ইতিমধ্যে ডেঙ্গুতে দুজনের মৃত্যু হয়েছে; দ্বিতীয় মৃত্যুটি ঘটে গত শনিবার।
স্বাস্থ্য বিভাগের জুন মাসে পরিচালিত এক জরিপে নগরের ৩৭০টি বাড়ির নমুনা পরীক্ষা করে দেখা গেছে, প্রতি ১০০টি বাড়ির মধ্যে ২৭টিতে এডিস মশার লার্ভা বিদ্যমান। এগুলোর ৭০-৮০ শতাংশই ‘এডিস ইজিপ্টাই’ প্রজাতির, যা ডেঙ্গুর প্রধান বাহক। জরিপের ভিত্তিতে নগরের উত্তর কাট্টলী, পাঁচলাইশ, জালালাবাদ, পশ্চিম বাকলিয়া, দক্ষিণ বাকলিয়া, দক্ষিণ হালিশহর, পাথরঘাটা ও আন্দরকিল্লা—এই আটটি ওয়ার্ডকে ‘অতি ঝুঁকিপূর্ণ’ বা রেড জোন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। হাসপাতালগুলোতেও এসব এলাকার রোগীর সংখ্যা সর্বোচ্চ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টানা বৃষ্টির পর অন্তত ২৮ দিন মশার প্রকোপ অব্যাহত থাকে। এর আগে টানা গরম পড়ায় এবং বর্তমানে থেমে থেমে বৃষ্টি হওয়ায় পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না। কীটতত্ত্ববিদদের মতে, উচ্চ তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা ডেঙ্গুর বিস্তারকে ত্বরান্বিত করছে।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি ৯৫ শতাংশ রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণ, এবারের ডেঙ্গুর ধরন আগের তুলনায় বেশি ছদ্মবেশী। জ্বর ও দুর্বলতার পাশাপাশি শ্বাসকষ্ট, শক সিনড্রোম ও ডায়রিয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিচ্ছে। শক সিনড্রোমে আক্রান্ত হলে রোগীর রক্তচাপ শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে জ্বর কমার পরের তিন দিনকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছেন তারা। এ সময় প্লাটিলেট কমে যাওয়া, রক্তচাপ কমা এবং লিভার, কিডনি বা মস্তিষ্ক আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বমি, তীব্র পেটব্যথা ও অতিরিক্ত ক্লান্তি দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকরা।
চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের কনসালট্যান্ট এইচ এম হামিদুল্লাহ মেহেদী জানান, এখন পর্যন্ত রোগীর চাপ খুব বেশি বাড়েনি। যারা এসেছেন তাদের মধ্যে জ্বর, বমি ও নিম্ন রক্তচাপের উপসর্গ ছিল। একজন রোগীর মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়ার ঘটনাও দেখা গেছে, যা ডেঙ্গুর একটি সাধারণ লক্ষণ। তবে ডেঙ্গুর বর্তমান ধরন সম্পর্কে নিশ্চিত হতে আরও কয়েকদিন সময় লাগবে বলেও জানান তিনি।
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন জাহাঙ্গীর আলম জানান, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১০০ শয্যার একটি নতুন ডেঙ্গু ওয়ার্ড এবং জেনারেল হাসপাতালে ২০ শয্যার ডেঙ্গু ব্লক চালু করা হয়েছে। অন্যান্য হাসপাতালেও ডেঙ্গুর জন্য অন্তত ১০ থেকে ১৫টি বেড সংরক্ষিত রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, “আমাদের প্রস্তুতি রয়েছে। আশা করছি এ বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যু কম হবে, তবে এর জন্য জনসাধারণকে সচেতন হতে হবে।”
নগরের বায়েজীদ এলাকা থেকে আসা রোগী মো. হৃদয় জানান, তার এলাকায় মশার উপদ্রব সম্প্রতি অনেক বেড়েছে। তিনি দুই দিন ধরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। জুনের জরিপ ও বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় চিকিৎসকরা মনে করছেন, সামনের দিনগুলোতে ডেঙ্গু সংক্রমণ আরও বাড়তে পারে। তাই সিটি করপোরেশন ও স্বাস্থ্য বিভাগের পাশাপাশি নাগরিকদের নিজ নিজ এলাকায় মশা নিয়ন্ত্রণে সচেতন ভূমিকা রাখার তাগিদ দিচ্ছেন তারা।




