গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে (ডিআরসি) ইবোলা প্রাদুর্ভাবে মৃতের সংখ্যা পাঁচশো ছাড়িয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত ১৫ মে প্রাদুর্ভাব ঘোষণার পর থেকে এ পর্যন্ত ১ হাজার ৫৬১টি সংক্রমণ রেকর্ড করা হয়েছে, যার মধ্যে ৫০৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রথম মাসটিকে এ পর্যন্ত রেকর্ড করা সবচেয়ে ভয়াবহ সময় বলে অভিহিত করেছে। বর্তমান প্রাদুর্ভাবের জন্য দায়ী ‘বুন্দিবুগিও’ স্ট্রেইনের চিকিৎসার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় ভাইরাসটির বিস্তার রোধ জটিল আকার ধারণ করেছে।
মানবিক সহায়তা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটি (আইআরসি) আগেই সতর্ক করেছিল, বিশ্বব্যাপী সহায়তা তহবিলে বড় কাটছাঁট সামনের সারির স্বাস্থ্যসেবা ও প্রস্তুতি ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিয়েছে। ফলে ২০১৮-২০২০ সালের মহামারীর তুলনায় কঙ্গোর স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এখন আরও নাজুক অবস্থায় রয়েছে; ওই সময়ে ইবোলায় আক্রান্ত হয়ে ২ হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন। সংস্থাটির জরুরি বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট বব কিচেন বলেন, “লাল সতর্কতা বাজছে। দ্বন্দ্ব বেড়ে যাওয়া এবং বিশ্ব সহায়তা তহবিলে কাটছাঁট প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিয়েছে, তাও আবার সবচেয়ে খারাপ সময়ে। প্রতিটি পূর্ববর্তী প্রাদুর্ভাব থেকে শিক্ষা স্পষ্ট: বিলম্ব মানেই প্রাণহানি। ঝুঁকি বাড়ছে আর সম্পদ কমছে—এটাই বিশ্ব সহায়তার নিষ্ঠুর বাস্তবতা।”
যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষতা বিভাগ (ডিওজিই) নামক বিশেষ উপদেষ্টা গ্রুপটি, যা এলন মাস্কের নেতৃত্বে পরিচালিত হতো, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউএসএআইডি-র কার্যক্রমে বড় পরিবর্তন আনে। ফেডারেল এই সংস্থাটি বিদেশি সহায়তা বিতরণে প্রধান ভূমিকা পালন করত এবং ডিওজিই তার প্রায় ৮৩ শতাংশ প্রোগ্রাম বাতিল করে দেয়। ডিওজিই আনুষ্ঠানিকভাবে ৪ জুলাই শেষ হলেও এর প্রভাব এখনও বিদ্যমান। রিফিউজিস ইন্টারন্যাশনালের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের মানবিক তহবিল ২০২৪ সালের ১৪ বিলিয়ন ডলার থেকে কমে ২০২৫ সালে ৩.৭ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। গত এক বছরে বিদেশি সহায়তায় এই কাটছাঁটের ফলে আনুমানিক ৭ লাখ ৫০ হাজারের বেশি প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যু ঘটেছে বলে অনুমান করা হচ্ছে।
ইউএসএআইডি আগের ইবোলা প্রাদুর্ভাব প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। হার্ভার্ড টি.এইচ. চ্যান স্কুল অব পাবলিক হেলথের সহযোগী অধ্যাপক ফুং ফাম জানান, অতীতে যুক্তরাষ্ট্র ইবোলাসহ বিভিন্ন সংক্রমণ মোকাবিলায় বিশ্বনেতা ছিল এবং ইউএসএআইডি সেই প্রচেষ্টার মূল হাতিয়ার ছিল। সংস্থাটি কঙ্গোর মতো দেশগুলোতে স্থায়ী উপস্থিতি বজায় রেখে ল্যাবরেটরি পরীক্ষার সক্ষমতা বাড়াত, স্বাস্থ্যকর্মীদের ভাইরাস শনাক্তকরণ ও নমুনা সংগ্রহের প্রশিক্ষণ দিত এবং স্থানীয় সম্প্রদায় ও ডব্লিউএইচও, ইউনিসেফের মতো সংস্থার মধ্যে সমন্বয় সাধন করত। ২০১৮ সালের প্রাদুর্ভাবের সময় ইউএসএআইডি তিন লাখের বেশি মানুষকে টিকা দিতে সহায়তা করেছিল।
সাম্প্রতিক সংকট মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট কঙ্গো ও উগান্ডায় ইবোলা নিয়ন্ত্রণে ২ কোটি ৩০ লাখ ডলারের জরুরি সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে, যার মাধ্যমে ৫০টি ক্লিনিক স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। গত মাসে হোয়াইট হাউস ইবোলা মোকাবিলায় কংগ্রেসের কাছে ১.৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি সহায়তা চেয়েছে। তবে ফাম মনে করেন, জরুরি প্রতিক্রিয়া প্রাদুর্ভাব শুরুর আগে প্রয়োজনীয় টেকসই বিনিয়োগের বিকল্প নয়।
ব্রাউন ইউনিভার্সিটি স্কুল অব পাবলিক হেলথের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ও সহযোগী অধ্যাপক ক্রেগ স্পেনসার বলেন, ডিওজিইর কারণে ইউএসএআইডি কাটছাঁটের প্রভাব ইতিমধ্যে অনুভূত হচ্ছে। নিউ ইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত এক নিবন্ধে তিনি উল্লেখ করেন, কিনশাসার একটি ল্যাবে ভাইরাসের নমুনা ভুল তাপমাত্রায় পৌঁছেছে—যা আগে ইউএসএআইডির অধীনেই তত্ত্বাবধান করা হত। তিনি লেখেন, “আমি ইবোলাকে কাছ থেকে দেখেছি। ২০১৪ সালে পশ্চিম আফ্রিকায় রোগীদের চিকিৎসা করতে গিয়ে আক্রান্ত হয়েছিলাম। আমি জানি এই রোগ কতটা ধ্বংসাত্মক—এবং আমরা এর প্রত্যাবর্তনের জন্য কতটা অপ্রস্তুত।”
বিপরীতে, এলন মাস্ক ইউএসএআইডি কাটছাঁটের মাধ্যমে ইবোলা বিস্তারে ডিওজিই’র নেতিবাচক ভূমিকা অস্বীকার করেছেন। ফেব্রুয়ারি ২০২৫-এ তিনি স্বীকার করেছিলেন যে ইবোলা প্রতিরোধের তহবিল ভুলবশত বন্ধ হয়েছিল, তবে তা দ্রুত পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। সম্প্রতি ডেমোক্রেটিক প্রতিনিধি রো খান্না মাস্ক ও ডিওজিইকে ইউএসএআইডি কাটছাঁটের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ শিশুর মৃত্যুর জন্য দায়ী করলে মাস্ক তা নাকচ করে এক্স-এ পোস্ট শেয়ার করে বলেন, এই অভিযোগ মিথ্যা এবং নিহতদের একজনও নাম উল্লেখ করতে পারেনি তারা।




