মার্ক কুকুরেয়াকে এখন তার কথা রাখতেই হবে। চলতি সপ্তাহের শুরুতে স্প্যানিশ এই লেফটব্যাক একটি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন—স্পেন বিশ্বকাপ জিতলে কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের মুখের ছবির ট্যাটু করাবেন নিজের শরীরে। স্পেন জিতেছে, আর কোচ নিজেই সেটি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তার বয়স এখন ৬৫, ট্যাটু আঁকার জন্য তা কিছুটা বেশি। তবে তিনি জানেন, তাঁর শিষ্যরা কথা রাখবে। আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে ১৬ বছর পর বিশ্বকাপ জেতানোর পর সংবাদ সম্মেলনে দে লা ফুয়েন্তে মৃদু হেসে বলেন, ট্যাটুটা হয়তো শরীরের এমন জায়গায় হবে যা বাইরে থেকে দেখা যায় না। প্রতিশ্রুতি দিলে তা পূরণ করতেই হবে—এটাই তাঁর বার্তা।
এই বিশ্বকাপ ফাইনাল সামনে রেখে কুকুরেয়ার মতো আরও অনেক স্প্যানিশ নানা প্রতিশ্রুতির বাঁধনে নিজেদের বেঁধেছিলেন। এখন খুশি মনেই সেসব ওয়াদা রাখার পালা। সেই খুশির রং লাল—স্পেনের জার্সির রং, যা এখন দেশের মানুষের উৎসবের রংও বটে। মাদ্রিদের প্লাজা দে সিবেলিসে জনতার উল্লাসে রাস্তায় ছড়িয়ে পড়েছে লাল আবির। এই স্পেন না জিতলে অবিচার হতো—সেই আবিরমাখা স্প্যানিশদের চোখ নিশ্চয়ই বারবার খুঁজেছে রদ্রিকে। চোটের 'নরক' দেখে আসা এই ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারই স্প্যানিশ আর্মাডার সাত রাজার ধন ফিরিয়ে এনেছেন। ২০২৪ সালে ইউরো জয়ের পর ডিসেম্বরে এসিএল চোটে তাঁর ক্যারিয়ারই শঙ্কায় পড়ে গিয়েছিল। সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে বিশ্বকাপ জিতে নিয়েছেন গোল্ডেন বল। এখন তাঁর শোকেসে আছে বিশ্বকাপ, ইউরো, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ও ব্যালন ডি'অর—চারটি বড় ট্রফি। এর আগে ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার, গার্ড মুলার ও জিনেদিন জিদান ছাড়া কেউ এ সাফল্য পাননি। রদ্রি বলেন, সবকিছু যেন একদম নিখুঁত চিত্রনাট্যের মতো। তিনি চান তরুণ প্রজন্ম দেখুক, কেউ স্বর্গের উচ্চতা স্পর্শ করার পর নরকের অতলে তলিয়ে গিয়েও কীভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারে।
গোল্ডেন বল জিতেছেন রদ্রি, তবে শিক্ষা রয়েছে সবার জন্য। গত পাঁচ বছরে নারী ও পুরুষ সব ফুটবল মিলিয়ে ১৬টি ট্রফি জিতেছে স্পেন। সময়টা আগে থেকেই ছিল তাদের, বিশ্বকাপ জিতে বর্তমানও তাদের, আর তরুণ খেলোয়াড়দের দিকে তাকিয়ে ভবিষ্যতও তাদের। স্প্যানিশ ফুটবল বিশেষজ্ঞ গিলেম বালাগের মতে, এ আধিপত্য আসলে 'নিখুঁত এক ঝড়... আরেকটি এভারেস্ট'। ছেলেদের দল ইউরো জয়ের দুই বছর পর বিশ্বকাপ জিতেছে—এটাই আবারও করল তারা। ফেরান তোরেস জয়সূচক গোলটি না করলে এই ঝড়ের ঝাপটা নিউ জার্সির ফাইনালে শেষ পর্যন্ত লাগত কি না, কে জানে! অথচ বিশ্বকাপে গোল না পাওয়ায় তাঁকে নিয়ে কত সমালোচনাই হয়েছে। ফেরান বলেন, ভাগ্যে লেখা ছিল, সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ যিনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার শক্তি দিয়েছেন। দে লা ফুয়েন্তে বলেন, ফেরানকে নিয়ে এটুকুই বলার—জীবন সত্যিই সুবিচার করে। যারা পড়ে গিয়েও উঠে দাঁড়ায়, তারা প্রতিদান পায়। এই সাফল্য সে নিজ যোগ্যতায় অর্জন করেছে।
ভালো আক্রমণভাগ ম্যাচ জিতলেও ট্রফি জেতে ভালো রক্ষণভাগ। স্পেনকে দেখে তাই মনে হয়। এই বিশ্বকাপে আট ম্যাচ খেলে স্পেন মাত্র একটি গোল হজম করেছে—বিশ্বকাপজয়ী কোনো দলের এটাই সবচেয়ে কম গোল হজমের রেকর্ড। পাউ কুবারসির মতো কুকুরেয়াও সেই রক্ষণভাগের প্রাণ। কুকুরেয়া বলেন, গোল হজম না করলে ম্যাচ জেতা অনেক সহজ হয়ে যায়। পুরো টুর্নামেন্টে রক্ষণে দারুণ কাজ করেছে দল, তবে এর কৃতিত্ব শুধু ডিফেন্ডার বা গোলরক্ষকের নয়—এটি পুরো দলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা। স্পেন সত্যিই দল হিসেবে খেলে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে, যেমনটা হয়েছিল ১৬ বছর আগে। পাসের খেলায় প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে দল হিসেবেই খেলতে হয়। তাই স্পেনের সবচেয়ে বেশি পাস (৫,৪৭০) খেলে চ্যাম্পিয়ন হওয়াটা স্বাভাবিক। এখন সময় সামনে তাকানোর। ড্রেসিংরুমের একটি ঘটনা জানিয়ে দে লা ফুয়েন্তে বলেন, ম্যাচ শেষে কিছু খেলোয়াড় জিজ্ঞাসা করেছিল, 'আমাদের কি এখনো সব জেতা বাকি?' তিনি উত্তর দিয়েছেন, সেপ্টেম্বরে পরবর্তী ম্যাচ ইংল্যান্ডের বিপক্ষে।




