প্রায় দুই যুগ পর আবারও টেস্ট ক্রিকেটের সাক্ষী হতে চলেছে অস্ট্রেলিয়ার উত্তরাঞ্চলীয় শহর ডারউইন। বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া সিরিজের প্রথম টেস্টকে ঘিরে শহরজুড়ে এখন ক্রিকেটের আমেজ। দীর্ঘ ২২ বছর ধরেই এই ভেন্যুতে টেস্ট ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়নি, যা ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছে এক বিস্ময়ের নাম।

২০০৩ সালে বাংলাদেশ দলই ছিল ডারউইনের প্রথম টেস্ট অতিথি। খালেদ মাহমুদ ও হাবিবুল বাশারদের সেই দলের পর ২০০৪ সালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে দ্বিতীয় টেস্ট আয়োজন করে মারারা স্টেডিয়াম, যা এখন টিআইও স্টেডিয়াম নামে পরিচিত। এরপরই যেন নির্বাসিত হয়ে যায় ডারউইন থেকে টেস্ট ক্রিকেট। তবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট পুরোপুরি বন্ধ ছিল না। ২০০৮ সালে বাংলাদেশের সঙ্গেই তিনটি ওয়ানডে খেলেছিল অস্ট্রেলিয়া এই মাঠে। এরপর দীর্ঘ বিরতি কেটে ২০২৫ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি সিরিজের মাধ্যমে পুরুষদের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফেরে ডারউইন।

কেন এত বছর টেস্ট হয়নি ডারউইনে? এর পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ। প্রথমত, অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট কাঠামো ঐতিহাসিকভাবেই দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলের বড় শহরগুলোকে ঘিরে গড়ে উঠেছে। সিডনি, মেলবোর্ন, ব্রিসবেন, অ্যাডিলেড এবং পার্থ—এই পাঁচ শহরই টেস্ট ক্রিকেটের পরিচিত ঠিকানা। ভৌগোলিকভাবে সেসব শহর থেকে বেশ দূরে অবস্থিত ডারউইন।

আবহাওয়াও বড় একটি কারণ। অস্ট্রেলিয়ার টেস্ট মৌসুম মূলত নভেম্বর থেকে জানুয়ারি, যখন ডারউইনে বর্ষাকাল ও প্রবল বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকে। অন্যদিকে জুন থেকে আগস্ট শীতের সময় ডারউইনের আবহাওয়া ক্রিকেটের জন্য চমৎকার হলেও তখন অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণাঞ্চলে শীতকাল, ফলে টেস্ট আয়োজন সেভাবে সম্ভব হয় না। এই সময়গত অসামঞ্জস্যতার কারণেই দীর্ঘদিন ডারউইনকে টেস্ট আয়োজন থেকে বঞ্চিত থাকতে হয়েছে।

তবে এখন পরিস্থিতি বদলাচ্ছে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সূচি এখন খেলায় ঠাসা। আইসিসির টুর্নামেন্ট, দ্বিপক্ষীয় সিরিজ আর ফ্র্যাঞ্চাইজি টুর্নামেন্টের চাপে ক্রিকেট ক্যালেন্ডারে জায়গা বের করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ডারউইনের মতো জায়গায় টেস্ট আয়োজন ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

বাণিজ্যিক দিক থেকেও ডারউইন এতদিন পিছিয়ে ছিল। জনসংখ্যা কম হওয়ায় বড় শহরগুলোর মতো দর্শকসমাগম ও পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া সহজ ছিল না। কিন্তু এবার সেই ধারণাও বদলাচ্ছে। বাংলাদেশের বিপক্ষে আসন্ন টেস্টের প্রায় সব টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে বলে জানা যাচ্ছে। দর্শকদের প্রায় অর্ধেকই আসবেন নর্দান টেরিটরির বাইরে থেকে। পর্যটন শহর ডারউইনে ক্রিকেট এখন পর্যটনের একটি বড় আকর্ষণ হয়ে উঠছে।

এই টেস্টের আরেকটি আকর্ষণ জেক ওয়েদারাল্ড। ডারউইন ক্রিকেট ক্লাব থেকে উঠে আসা এই তরুণ ডেমিয়েন মার্টিনের পর ডারউইনের দ্বিতীয় টেস্ট ক্রিকেটার হতে চলেছেন। ২০০৩ সালে মাত্র আট বছর বয়সে বাংলাদেশের টেস্ট দেখতে মাঠে গিয়েছিলেন তিনি। ২০২৬ সালে হয়তো ঘরের মাঠেই তাঁকে টেস্টের পোশাকে দেখা যাবে।

ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার প্রধান নির্বাহী ট্রড গ্রিনবার্গ উত্তরাঞ্চলে আরও বেশি খেলা আয়োজনের কথা আগেই বলেছিলেন। বাংলাদেশের বিপক্ষে এই দুই টেস্ট ভেন্যু ডারউইন ও ম্যাকাই নির্বাচন সেই পরিকল্পনারই অংশ। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট-সূচিকে সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার এই উদ্যোগ নর্দান টেরিটরির তরুণ ক্রিকেটারদের জন্য বড় স্বপ্ন দেখার সুযোগ তৈরি করছে।