বাস্তব জীবন যেন সিনেমাকেও হার মানায়। খ্যাতি, মাদকাসক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রাম, পারিবারিক টানাপোড়েন, আইনি জটিলতা ও কারাবাস—সব মিলিয়েই সঞ্জয় দত্তের অস্তিত্ব। কিংবদন্তি দম্পতি সুনীল দত্ত ও নার্গিসের এই সন্তান ২৯ জুলাই জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৯৫৯ সালে। ৬৭ বছর বয়সী এই অভিনেতা চার দশকের বেশি সময় ধরে ভারতীয় চলচ্চিত্রে সক্রিয়। রুপালি পর্দায় প্রেমিক থেকে গ্যাংস্টার, খলনায়ক থেকে কৌতুকপ্রিয় চিকিৎসক—বিবিধ চরিত্রে দর্শকদের মন জয় করেছেন তিনি। কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বিতর্কিত অধ্যায়টি কোনো সিনেমার নয়; সেটি ১৯৯৩ সালের মুম্বাই ধারাবাহিক বিস্ফোরণ মামলার তদন্ত, বেআইনি অস্ত্র মামলা এবং কারাবাসের দিনগুলো।
অভিনয়ের শুরুটাই ছিল শোকের মধ্যে দিয়ে। ১৯৮১ সালে সুনীল দত্তের নির্দেশনায় 'রকি' দিয়ে নায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন সঞ্জয়। দুর্ভাগ্যবশত, ছবিটি মুক্তির আগেই ক্যানসারে মৃত্যু হয় মা নার্গিসের। ছেলের প্রথম সিনেমা আর দেখা হয়নি তার। 'রকি' সাফল্য পেলেও ব্যক্তিগত সংকট ও মাদকাসক্তি শুরু থেকেই সঞ্জয়ের পথ মসৃণ হতে দিতে পারেনি, ফলে পুনর্বাসন কেন্দ্রেও যেতে হয়েছিল। পরবর্তীতে 'নাম', 'সাজন', 'সড়ক', 'খলনায়ক', 'বাস্তব', 'মিশন কাশ্মীর' এর মতো ছবির মাধ্যমে তিনি নিজের শক্তিশালী অবস্থান গড়ে তোলেন। 'মুন্না ভাই এমবিবিএস'-এর মাধ্যমে তাঁর ক্যারিয়ারে এক নতুন মোড় আসে, যা নব্বই প্রজন্মের দর্শকদের কাছেও তাঁকে সমাদৃত করে। সাম্প্রতিক সময়ে 'কেজিএফ: চ্যাপ্টার ২'-এ ভয়ংকর অধীরার ভূমিকায় অভিনয় করে তিনি আবারও নিজেকে চেনান।
১৯৯৩ সালের ১২ মার্চ মুম্বাইয়ের সিরিজ বোমা বিস্ফোরণ তদন্তেই সঞ্জয়ের কাছে অবৈধ অস্ত্রের সন্ধান পায় পুলিশ। নথি বলছে, তিনি তিনটি একে-৫৬ রাইফেল গ্রহণ করলেও পরে একটি নিজের কাছে রেখেছিলেন। সঞ্জয় সর্বদা দাবি করেন, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার প্রেক্ষিতে পরিবারের সুরক্ষার জন্য তিনি এমন করেছিলেন। তবে বিস্ফোরণের ষড়যন্ত্রে যুক্ত নয় বলে তাঁকে খালাস দেয়া হয়। দণ্ডিত করা হয় কেবল অস্ত্র আইনে। ২০০৭ সালে টাডা আদালত ৬ বছর ও ২০১৩ সালে সুপ্রিম কোর্ট ৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড চুড়ান্ত করে।
তদন্তকারী আইপিএস রাকেশ মারিয়ার স্মৃতিচারণা থেকে জানা যায়, সঞ্জয়ের নাম প্রথম আসে হানিফ কদাওয়ালা ও সামীর হিঙ্গোরার মাধ্যমে। প্রথমে তাঁরা 'সঞ্জু বাবা'র নাম উল্লেখ করলে পুলিশই বিস্মিত হয়। সঞ্জয়কে যখন মরিশাস থেকে ফিরিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়, এক পর্যায়ে রাকেশ নিজেই সঞ্জয়কে চড় মারেন বলে দাবি করেন। এরপর সঞ্জয় ভেঙে পড়েন ও ঘটনার বর্ণনা দেন, একটাই অনুরোধ ছিল— 'বাবাকে যেন বলবেন না।' তবে বাবা সুনীল দত্তসহ নির্মাতা মহেশ ভাট, যশ জোহরের মতো ঘনিষ্ঠদের সামনে পায়ে পড়ে ক্ষমা চাওয়ার দৃশ্য ছিল সবচেয়ে হৃদয়বিদারক।
পরবর্তী দুই দশক ধরে গ্রেপ্তার, জামিন ও কারাদণ্ডের চক্র আবর্তিত হয়। শেষ দফায় ২০১৩ সালে ইয়েরওয়াড়া কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয় সঞ্জয়কে। সেখানে তাঁর পরিচয় ছিল কেবল 'কয়েদি নম্বর ১৬৬৫৬'। মহারাষ্ট্র সরকার আদালতকে জানায়, নিয়ম অনুযায়ী সাধারণ বন্দীর মতোই ভোরে ঘুম থেকে ওঠা, গোনায় দাঁড়ানো, নির্ধারিত শ্রম দেওয়া—সবই পালন করতে হয়েছে।
কারাগারের অভিনতত্ত্ব ভোর সাড়ে পাঁচটায় শুরু হতো সঞ্জয়ের দিন। প্রধান কাজ ছিল পুরোনো সংবাদপত্র দিয়ে কাগজের ব্যাগ বানানো। প্রতিটি ব্যাগের জন্য মজুরি মিলত ২০-২৫ পয়সা, আর প্রতিদিন ৫০ থেকে ১০০টি বানাতেন তিনি। কাঠের চেয়ার ও আসবাবের কাজও করেছেন। প্রায় সাড়ে তিন বছরের শ্রমে তার জমা হয়েছিল মাত্র ৪০০-৫০০ রুপি, যা পরবর্তীতে স্ত্রী মান্যতাকে দিয়ে তিনি বলেন, 'এই ৫০০ রুপির মূল্য আমার কাছে হাজার কোটি টাকার বেশি।' কারা কর্তৃপক্ষের হিসাবে তার মোট আয় হয়েছিল ৩৮ হাজার রুপি, কিন্তু ক্যান্টিনে খরচ করায় মুক্তির সময় মাত্র ৪৫০ রুপি অবশিষ্ট ছিল।
ইয়েরওয়াড়া কারাগারের ভিতরে সঞ্জয় চালু করেন 'রেডিও ওয়াইসিপি' নামে এক অভিনয় অনুষ্ঠান, যা শুধু জেলেই শোনা যেত। সেখানে তিনি সংবাদপাঠ, গান ও কৌতুক পরিবেশন করতেন। একটি নাট্যদলও গড়ে তুলেছিলেন, যেখানে খুনের দায়ে দণ্ডিত বন্দীরা অভিনয় করত। তিনি নাটক পরিচালনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগ দিতেন। একাকী সময়ে প্রায় কয়েকশ' কবিতা ও দ্বিপদী লিখে 'সালাখেঁ' নামে একটি বই প্রকাশেরও পরিকল্পনা ছিল। লেখালেখি তাকে মানসিক শক্তি জুগিয়েছিল।
সবচেয়ে কষ্ট ছিল পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা। মান্যতা ও যমজ সন্তান ইকরা-শাহরানের ছোট হয়ে ওঠার সময়ে তিনি পাশে ছিলেন না। প্যারোল ও ফার্লো পেয়েছেন কয়েক দফা, যা নিয়ে অভিযোগ ওঠে যে তাকে অতিরিক্ত সুবিধা দেয়া হচ্ছে। তবে বোম্বে হাইকোর্ট ও মহারাষ্ট্র সরকার পরে জানিয়েছিল, নিয়ম অনুসারেই সব হয়েছে। ভালো আচরণের জন্য তার সাজার মেয়াদ থেকে ২৫৬ দিন মওকুফ করা হয়।
অবশেষে ২০১৬ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি, ৪২ মাস শেষে মুক্তি পান সঞ্জয় দত্ত। ফটকের বাইরে এসে মাটিতে মাথা ঠেকান, স্যালুট জানান কারাগারকে। এরপর সিধিবিনায়ক মন্দিরে ও মা নার্গিসের সমাধিতে শ্রদ্ধা জানিয়ে জীবনের নতুন পথে হাঁটা শুরু করেন। নিজের জীবনের গল্প নিয়ে ২০১৮ সালে 'সঞ্জু' নির্মিত হলে তা বিপুল সফলতা পায়, যদিও সহানুভূতির আধিক্য ও বিষয়বস্তু হালকা করার অভিযোগ ওঠে। কিন্তু সঞ্জয় দত্তের গল্প থেমে থাকেনি— খলনায়ক ও চরিত্রাভিনেতা হিসেবে তিনি দৈপ দেরির প্রতিপর্ব হয়ে আবারও ইন্ডাস্ট্রিরে আবির্ভূত হয়েছেন। কারাবাস থেকে ফিরে তিনি বুঝিয়েছেন, ভুল করে তার ক্ষমা চাওয়া ও মূল্য পরিশোধের মধ্য দিয়েই শৃঙ্খলা ও পরিশ্রমের মূল্য শিখেছে।




