বাংলা চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় মুখ সারাহ বেগম কবরী, যিনি 'মিষ্টি মেয়ে' নামে পরিচিত, তার ৭৬তম জন্মদিন আজ। ১৯৫০ সালের ১৯ জুলাই চট্টগ্রামের বোয়ালখালীতে জন্ম নেওয়া এই শিল্পী মাত্র ১৪ বছর বয়সে সুভাষ দত্তের 'সুতরাং' ছবির মাধ্যমে রুপালি পর্দায় পা রাখেন। এরপর 'সুজন সখী', 'সারেং বৌ', 'ময়না মতি', 'নীল আকাশের নীচে', 'তিতাস একটি নদীর নাম'-এর মতো অসংখ্য স্মরণীয় সিনেমায় অভিনয় করে তিনি বাংলা সিনেমার ইতিহাসে অম্লান হয়ে আছেন। তবে অভিনয়ের পাশাপাশি নির্মাতা হিসেবেও নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে চেয়েছিলেন তিনি। ২০০৬ সালে 'আয়না' ছবির মাধ্যমে পরিচালনায় আত্মপ্রকাশের পর দীর্ঘ ১৪ বছরের বিরতি ভেঙে সরকারি অনুদানে দ্বিতীয় সিনেমা 'এই তুমি সেই তুমি'-এর কাজ শুরু করেন কবরী। ছবিটির কাহিনি, চিত্রনাট্য ও সংলাপ তিনিই লিখেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ ও সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে নির্মিত এই ছবিতে মুখ্য ভূমিকায় দেখা যাবে নিশাত সালওয়া ও রায়হান রিয়াদকে।
২০২০ সালে করোনা মহামারির মধ্যেই শুটিং শুরু হয় 'এই তুমি সেই তুমি'-এর। কবরী সব ভয় উপেক্ষা করে কাজ চালিয়ে যান। প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল ছবির কাজ; বাকি ছিল মাত্র দুই দিনের দৃশ্যধারণ। কিন্তু ২০২১ সালের এপ্রিলে করোনায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন তিনি। ১৭ এপ্রিল চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যুতে থমকে যায় পুরো প্রকল্প। মায়ের মৃত্যুর পর ছেলে শাকের চিশতী দায়িত্ব নেন। চলচ্চিত্রে পড়াশোনা করা চিশতী কবরীর রেখে যাওয়া স্টোরিবোর্ড ও ডায়েরির পরিকল্পনা অনুসরণ করে বাকি অংশের শুটিং শেষ করেন। ডাবিং ও সম্পাদনার কাজও শেষ হয়।
২০২৩ সালের শেষ দিকে চিশতী জানান, ছবির নির্মাণকাজ পুরোপুরি সমাপ্ত এবং আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে দেখিয়ে তারপর দেশে মুক্তি দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু এরপর আরও কয়েক বছর পেরিয়ে গেলেও নতুন কোনো ঘোষণা আসেনি। সম্প্রতি গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে চিশতী দাবি করেন, আন্তর্জাতিক উৎসবে পাঠানোর জন্য সাবটাইটেল যুক্ত করার কাজ চলছে এবং দেশীয় মুক্তির প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে। তাঁর মতে, সেন্সর ছাড়পত্রের জন্য বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সার্টিফিকেশন বোর্ডে জমা দেওয়া হয়েছে ছবিটি। ছাড়পত্র পেলেই দেশের প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি দেওয়া হবে।
তবে এখানেই দেখা দিয়েছে গোলমাল। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, সরকারি অনুদানের কোনো সিনেমা বিদেশের উৎসবে পাঠাতে হলে মন্ত্রণালয়কে আগেই জানাতে হয় এবং চলচ্চিত্র সার্টিফিকেশন বোর্ডের অনুমোদন নিতে হয়। কিন্তু বোর্ডের উপপরিচালক মঈনউদ্দীন জানিয়েছেন, রোববার পর্যন্ত তাদের কাছে 'এই তুমি সেই তুমি' সার্টিফিকেশনের জন্য জমা পড়েনি। ফলে ছবিটির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে বোর্ডের কোনো ধারণা নেই। অন্যদিকে মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সরকারি অনুদানের ছবির শুটিং শেষ হলে মন্ত্রণালয়কে জানানো বাধ্যতামূলক। তারপর বকেয়া কিস্তির অর্থ প্রযোজককে দেওয়া হয়। কিন্তু এখনও ছবিটির শুটিং শেষ হওয়ার খবর মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়নি। তৃতীয় কিস্তির অর্থ সংক্রান্ত কোনো আবেদনও প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে জমা পড়েনি। ফলে প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় ছবিটির অগ্রগতির কোনো রেকর্ড পাওয়া যাচ্ছে না।
একদিকে নির্মাতাপক্ষ দাবি করছে ছবি মুক্তির জন্য প্রস্তুত, অন্যদিকে সরকারি সূত্রগুলো বলছে প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতার কোনো তথ্য তাদের কাছে নেই। এই ছবির জন্য কবরী প্রথমবারের মতো গানও লিখেছিলেন। সংগীত পরিচালনা করেন সাবিনা ইয়াসমিন, আর গান গেয়েছেন ইমরান ও কোনাল। সিনেমাটি তাঁর নির্মাতাজীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্নগুলোর একটি ছিল। কিন্তু সেই স্বপ্নের ছবিটি কবে বড় পর্দায় আসবে, নাকি আদৌ আসবে—সেই প্রশ্নের উত্তর এখনও অনিশ্চিত রয়ে গেছে।




