হাঁস-মুরগির সম্পূর্ণ অজানা একটি ভাইরাস আবিষ্কার করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন বাংলাদেশি তরুণী মারজানা আক্তার। এশিয়ান সায়েন্টিস্ট প্রকাশিত এশিয়ার সেরা ১০০ বিজ্ঞানীর তালিকায় স্থান পাওয়া সবচেয়ে কম বয়সী গবেষক হিসেবে তিনিই এখন শীর্ষে। জাতিসংঘের ফেলোশিপপ্রাপ্ত এই বিজ্ঞানীর অসাধারণ গবেষণা, জীবনের কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে লড়াইয়ের গল্প এবং ভবিষ্যৎ বিজ্ঞানীদের জন্য তাঁর অনুপ্রেরণামূলক বক্তব্য নিয়ে বিজ্ঞানচিন্তার পক্ষ থেকে সুমনকুমার দাশের সাক্ষাৎকারটি পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।
এশিয়ার সেরা ১০০ বিজ্ঞানীর তালিকায় নিজের নাম দেখে আবেগাপ্লুত মারজানা বলেন, এটি তাঁর জন্য অত্যন্ত সম্মানের এবং একই সঙ্গে বিশাল দায়িত্বের একটি মুহূর্ত। একজন তরুণ বাংলাদেশি গবেষক হিসেবে এই স্বীকৃতি তাকে আনন্দিত করেছে, তবে তার চেয়েও বেশি অনুপ্রাণিত করেছে। তিনি মনে করেন, এটি কেবল তাঁর ব্যক্তিগত অর্জন নয়; বরং বাংলাদেশের তরুণ বিজ্ঞানীদের সম্ভাবনা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ক্রমবর্ধমান উপস্থিতিরও একটি স্বীকৃতি। এ অর্জনের পেছনে তিনি তাঁর শিক্ষক, গবেষণা সহকর্মী, পরিবার ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের অবদানের কথা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন।
সহজ ভাষায় নিজের গবেষণার বিষয়টি ব্যাখ্যা করে মারজানা জানান, তাঁর মূল কাজ সংক্রামক রোগ, ভাইরাসের জিনগত বৈশিষ্ট্য ও বায়োসিকিউরিটি নিয়ে। অর্থাৎ রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণুর জিনগত পরিবর্তন কীভাবে ঘটে, নতুন নতুন ধরন কীভাবে তৈরি হয় এবং সেগুলো কীভাবে দ্রুত শনাক্ত করা যায়—এসব বিষয়েই তাঁর গবেষণা পরিচালিত হচ্ছে। পাশাপাশি গবেষণাগারে নিরাপদভাবে জীবাণু নিয়ে কাজ করা এবং ভবিষ্যতের সংক্রামক রোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি নিয়েও তাঁর আগ্রহ রয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য এই গবেষণার উপকারিতা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বাংলাদেশে সংক্রামক রোগ এখনো জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। গবেষণার মাধ্যমে রোগজীবাণুর পরিবর্তন দ্রুত শনাক্ত করতে পারলে রোগনিয়ন্ত্রণ, টিকা উন্নয়ন, রোগের নজরদারি এবং কার্যকর নীতি গ্রহণ অনেক সহজ হবে। শক্তিশালী বায়োসিকিউরিটি ব্যবস্থা দেশের স্বাস্থ্যনিরাপত্তা এবং ভবিষ্যতের মহামারি মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়াতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে তিনি মনে করেন।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে মারজানা বলেন, তিনি সংক্রামক রোগ, জিনোমিকস এবং বায়োসিকিউরিটি নিয়ে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা চালিয়ে যেতে চান। পাশাপাশি বাংলাদেশের গবেষণা অবকাঠামো, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং তরুণ গবেষকদের দক্ষতা উন্নয়নে অবদান রাখতে চান। তাঁর লক্ষ্য এমন গবেষণা করা, যা শুধু বৈজ্ঞানিক জ্ঞান বাড়াবে না; বরং দেশের জনস্বাস্থ্য ও নীতিনির্ধারণেও বাস্তব ভূমিকা রাখবে।
বিজ্ঞানী হতে চাওয়া তরুণদের উদ্দেশে তাঁর পরামর্শ—প্রথমত, কৌতূহলী হতে হবে এবং প্রশ্ন করতে শিখতে হবে। বিজ্ঞানে সফল হওয়ার জন্য শুধু ভালো ফল করাই যথেষ্ট নয়; ধৈর্য, নিয়মিত শেখার আগ্রহ এবং ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার মানসিকতাও খুব গুরুত্বপূর্ণ। ছোট ছোট গবেষণার সুযোগ, বই পড়া, বৈজ্ঞানিক লেখা অনুসরণ করা এবং ভালো মেন্টরের সঙ্গে কাজ করার মাধ্যমে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাওয়া উচিত। যারা তাঁর সঙ্গে গবেষণা করতে আগ্রহী, তারা যোগাযোগ করতে পারেন। তিনি সব সময় শিখতে আগ্রহী এবং পরিশ্রমী শিক্ষার্থীদের উৎসাহ দেন। গবেষণার সুযোগ ও প্রকল্প অনুযায়ী ভবিষ্যতে একসঙ্গে কাজ করার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে।
বিজ্ঞানচিন্তার বেশির ভাগ পাঠক কিশোর ও তরুণ। তাদের উদ্দেশে মারজানা বলেন, "আমার একটিই কথা—কৌতূহলকে কখনো হারিয়ে ফেলো না। বড় আবিষ্কার অনেক সময় খুব সাধারণ একটি প্রশ্ন থেকেই শুরু হয়। বিজ্ঞান শুধু পরীক্ষাগারে সীমাবদ্ধ নয়, এটি আমাদের চারপাশের পৃথিবীকে বুঝতে শেখায়। তাই স্বপ্ন দেখতে ভয় পেয়ো না, প্রশ্ন করতে দ্বিধা কোরো না এবং শেখার আনন্দ ধরে রাখো। আজকের কৌতূহলী একজন শিক্ষার্থীই আগামী দিনের একজন বিজ্ঞানী হতে পারে।"
লেখাটি ২০২৬ সালে বিজ্ঞানচিন্তায় জুলাই সংখ্যায় প্রকাশিত হয়।




