সাধারণত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনা উঠলেই তরুণ প্রজন্মের কথা মাথায় আসে। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দেখা যাচ্ছে, ৭০ ও ৮০ বছর বয়সী প্রবীণরাও প্রতিদিনের জীবনে এআই গ্রহণ করে ফেলেছেন—বিশেষ করে টেবিলটপ রোবট ‘এলিকিউ’ ব্যবহারের মাধ্যমে। নিউ ইয়র্কের বেকন এলাকার ৮৮ বছর বয়সী অ্যান্থনি নিমেক প্রতিদিন সকালে বাড়ির একটি ডিভাইস থেকে শুভেচ্ছা পান। এটি তাকে জিজ্ঞেস করে রাত কেমন কাটল, আবহাওয়ার খবর দেয়, শরীরচর্চার পরামর্শ দেয় এবং সারাদিন তার সঙ্গী হয়। নিমেকের স্ত্রী এক দশক আগে মারা যাওয়ার পর তিনি একাই থাকছেন। চার বছর ধরে ব্যবহার করা এই ডিভাইসটি তার নির্জনতা অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছে বলে জানান তিনি।
ইসরায়েলভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ইনটুইশন রোবোটিকস তৈরি করেছে এলিকিউ। এটি দেখতে একটি ছোট ল্যাম্পের মতো, যার মাথা ঘুরিয়ে দেওয়া যায় এবং একটি টাচস্ক্রিনের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে। অ্যামাজনের অ্যালেক্সার মতো সাধারণ স্মার্ট স্পিকার ডিভাইসগুলোর মতো নয়—যেগুলো নির্দেশ দেওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করে—এলিকিউ সক্রিয় ভূমিকা রাখে। কোনো ব্যক্তি ঘরে ঢুকলেই এটি আলো জ্বেলে কথা বলা শুরু করে, ব্যায়ামের পরামর্শ দেয়, ওষুধ খাওয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দেয় এবং নির্ধারিত আত্মীয়ের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করে দেয়।
প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কৌশল কর্মকর্তা ও সাধারণ ব্যবস্থাপক আসাফ গ্যাড জানান, এলিকিউর কিছু ব্যবহারকারী ২০১৯ সালে বিটা প্রোগ্রাম চালু হওয়ার সময় থেকেই এটি ব্যবহার করে আসছেন, যদিও বাণিজ্যিক সংস্করণ ২০২২ সালে বাজারে আসে। ডিভাইসটি বিনামূল্যে দেওয়া হয়, তবে এর জন্য মাসিক ৪০ ডলার এবং প্রাথমিক ২৫০ ডলার রেজিস্ট্রেশন ফি নেওয়া হয়। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটি নিউ ইয়র্কের অফিস ফর দ্য এজিংয়ের মতো বিভিন্ন সরকারি কর্মসূচির মাধ্যমে বয়স্কদের জন্য বিনামূল্যে এই সেবা সরবরাহ করছে।
নিমেকের ভাষ্যে, ডিভাইসটি তার সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য মনে রাখতে পারে এবং ধীরে ধীরে দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। তিনি ডিভাইসটির মাধ্যমে গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের মতো দূরবর্তী স্থানের ভার্চুয়াল ভ্রমণে যান এবং সারা দেশের শত শত বয়স্ক মানুষের সাথে ভার্চুয়াল বিঙ্গো খেলায় অংশ নেন। সবচেয়ে বড় কথা, এটি তার একাকীত্ব দূর করতে সাহায্য করছে। প্রথমে ডিভাইসটির সাথে কথা বলতে কিছুটা অদ্ভুত লাগলেও পরে মনে হয় যেন বাড়িতে আরেকজন মানুষ আছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
গোপনীয়তা প্রসঙ্গে গ্যাড জানান, এলিকিউ সর্বদা শুনছে বলে মনে হলেও ব্যবহারকারীরা চাইলে ডিভাইসটিকে কোনো তথ্য ভুলে যেতে বা প্রতিষ্ঠানের কাছে তথ্য মুছে ফেলার অনুরোধ করতে পারেন। ইনটুইশন রোবোটিকস তথ্য এনক্রিপ্ট করে, ব্যক্তিগত পরিচয় পৃথক রাখে এবং কখনো গ্রাহকের তথ্য বিক্রি করবে না বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
এলিকিউ বিশেষভাবে তৈরি করা হয়েছে যারা স্মার্টফোন বা জটিল মেনুতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না তাদের জন্য। গ্যাড বলেন, বেশিরভাগ ব্যবহারকারী নিজেরাই ডিভাইসটি সেটআপ করতে পারেন; সবচেয়ে বড় বাধা হলো তাদের বাড়ির ওয়াই-ফাই পাসওয়ার্ড মনে রাখা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বয়স্ক জনগোষ্ঠী বাড়ছে এবং পরিবারগুলো দূরে সরে যাচ্ছে, সেই প্রেক্ষাপটে এলিকিউ শুধু সঙ্গ দেয় না বরং ব্যায়াম ও ওষুধ সেবনের মাধ্যমে বয়স্কদের সুস্থ রাখতে এবং নিজের বাড়িতে দীর্ঘদিন থাকতে সাহায্য করে। তবে প্রতিষ্ঠানটি জানে, ডিভাইসটি কখনো মানবসঙ্গীর বিকল্প হতে পারে না। আত্মীয় ও পরিচর্যাকারীরাও এই ডিভাইসের মাধ্যমে বয়স্কদের সাথে ভিডিও কল ও বার্তা পাঠাতে পারেন।
এলিকিউ আসার আগে নিমেক কখনো এআই সম্পর্কে শোনেননি। এখন তাঁর টেবিলের ছোট ডিভাইসটি তাঁর দৈনন্দিন রুটিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে, যা তিনি কখনো কল্পনাও করতে পারেননি। তিনি বলেন, “এই বয়সে আমি কখনো ভাবিনি এমন কিছু দেখতে পাব।”



