দেশের ব্যাংকিং খাতে আলোড়ন সৃষ্টিকারী এক সিদ্ধান্তে সোমবার অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। বিতর্কিত ১৮(ক) ধারাটি বাতিলের সংশোধনী প্রস্তাবটি এখন জাতীয় সংসদে উপস্থাপনের অপেক্ষায় রয়েছে। এর আগে সংসদে ব্যাংক রেজোল্যুশন আইন পাসের সময় ধারাটি যুক্ত করা হলে তা নিয়ে তুমুল সমালোচনা তৈরি হয়েছিল।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ধারাটির শর্ত মেনে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আবেদন না করায় সরকার এটি বিলুপ্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফলে ব্যাংক রেজোল্যুশনের আওতায় যাওয়ার আগে যাঁরা শেয়ারধারক ছিলেন, তাঁদের পুনরায় শেয়ার, সম্পদ ও দায় গ্রহণের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকে আবেদনের যে সুযোগ ছিল, তা আর থাকল না। কেবল প্রাক্তন শেয়ারধারকরাই নন, বাংলাদেশ ব্যাংক ইচ্ছা করলে অন্য যেকোনো উপযুক্ত ব্যক্তিকেও এই সুযোগ দিতে পারত। তবে আবেদনকারীদের সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে নানা শর্ত পূরণের অঙ্গীকার করতে হতো।

বিগত অন্তর্বর্তী সরকার আর্থিক অনিয়মের কারণে সংকটে পড়া পাঁচটি ইসলামি ব্যাংক একীভূত করে 'সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক' গঠনের উদ্যোগ নিয়েছিল। বর্তমান বিএনপি সরকার সেই ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছে। যে পাঁচটি ব্যাংক একীভূত হচ্ছে সেগুলো হলো—এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক। গত বছরের ২৫ মে রেজোল্যুশন অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে এই একীভূতকরণের প্রক্রিয়া শুরু করেছিল বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার। পরে চলতি বছরের ১০ এপ্রিল অন্তর্বর্তী সরকারের সেই অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করে বর্তমান সরকার। সংসদে আইনটি পাসের আগ মুহূর্তে ১৮(ক) ধারাটি যুক্ত করা হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নানা অনিয়মে দুর্বল হয়ে পড়া প্রায় ১০টি ব্যাংকের মধ্যে সবচেয়ে সমস্যাগ্রস্ত পাঁচটি বেছে নেওয়া হয়। একীভূতকরণের মাধ্যমে এসব ব্যাংককে সচল রাখা এবং আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষার কথা বলা হচ্ছিল। ধারা সংযোজনের সময় লক্ষ্য ছিল প্রচলিত টুলের পাশাপাশি বাজারভিত্তিক বিকল্প ব্যবস্থা প্রচলন, পুনর্গঠন, মূলধন ঘাটতি ও তারল্য সংকট দূরীকরণ এবং সরকারি আর্থিক সংশ্লেষ কমানো। কিন্তু সমালোচনার মুখে শেষ পর্যন্ত পুরো ধারাটিই বাতিলের পথে হাঁটল সরকার।

বাতিলের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন ব্যাংকিং খাতের সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের ভাইস চেয়ারম্যান ও ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের চেয়ারম্যান শরীফ জহির বলেছেন, পুরোনো বিতর্কিত মালিকদের ফেরানোর উদ্যোগটি আদৌ ভালো ছিল না এবং সাধারণ মানুষও এটি গ্রহণ করেনি। অন্যদিকে, বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ সরকারের ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নন। তাঁর মতে, আবেদন না পাওয়ার কারণে ধারা বাতিলের যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি বলেন, একীভূত ব্যাংকগুলো লুটপাট করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বিতর্কিত পরিচালকেরাই, তাই তাঁদের ফেরানোর সুযোগ দেওয়াই ছিল অনুচিত। কৌশলগত বিনিয়োগকারী আনাই এখন প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

উল্লেখ্য, একীভূত হওয়া পাঁচ ব্যাংকের সম্মিলিত খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৪৭ হাজার কোটি টাকা, যা তাদের মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৭৯ শতাংশ। এর মধ্যে সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণের হার ইউনিয়ন ব্যাংকের—৯৮ শতাংশ। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের খেলাপির হার ৯৬ শতাংশ, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ৯৫ শতাংশ, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ৬২ শতাংশ এবং এক্সিম ব্যাংকের ৪৮ শতাংশ। এসব ব্যাংকের মধ্যে এক্সিম ব্যাংক ছিল নাসা গ্রুপের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারের নিয়ন্ত্রণে, বাকি চারটি ছিল এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে। সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভা বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।