মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট করেই জানিয়ে দিয়েছেন, ইরানের সাথে বিদ্যমান যুদ্ধবিরতি আর কার্যকর নেই। তবে তিনি একই সঙ্গে দাবি করেছেন, ধারাবাহিক সামরিক হামলার অর্থ এই নয় যে পরিস্থিতি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ বা দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে রূপ নিচ্ছে। ট্রাম্পের এই পরস্পরবিরোধী অবস্থান বিশ্লেষকদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে। মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে দুই বিরোধী দেশের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য কঠিন কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল। সেই প্রচেষ্টার পরই এখন সংঘাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ট্রাম্পের বক্তব্যে এই হঠাৎ পরিবর্তনকে অনেকে তেহরানের ওপর চাপ সৃষ্টির কৌশল হিসেবে দেখছেন। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে তেল ও গ্যাসবাহী জাহাজে হামলা বন্ধ করতে এবং ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে ওয়াশিংটনের শর্ত মেনে নিতে বাধ্য করতেই তিনি এই পথ বেছে নিয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই ধরনের কৌশল তিনি অতীতেও ব্যবহার করেছেন। এটি আলোচনারই একটি অংশ নাকি যুদ্ধ আরও ছড়িয়ে দেওয়ার ইঙ্গিত, তা নিয়ে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাচ্ছে না। এদিকে মধ্যস্থতাকারীরা অন্তর্বর্তীকালীন এই চুক্তি টিকিয়ে রাখতে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। বর্তমান উত্তেজনা আরও বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি করেছে, যা আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে রিপাবলিকানদের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হতে পারে। ট্রাম্প পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ এড়ানোর কথা বললেও বুধবার মার্কিন বাহিনী ইরানে নতুন করে হামলা চালিয়েছে। জবাবে তেহরান হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, হরমুজ প্রণালি আবারও বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে। যুদ্ধবিরতি রক্ষায় কর্মকর্তাদের তৎপরতা প্রসঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দুই পক্ষের মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস বাড়তে থাকায় সংঘাত এখন অত্যন্ত সংবেদনশীল পর্যায়ে পৌঁছেছে। তবে পর্দার আড়ালে সংবেদনশীল আলোচনা টিকিয়ে রাখতে উচ্চ পর্যায়ে নিয়মিত যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলার ঘটনায় ওয়াশিংটন ক্ষুব্ধ। একই সঙ্গে পরমাণু কর্মসূচি সীমিত করার আলোচনায় ধীরগতির জন্য তারা ইরানকে দায়ী করছে। গত মাসে ঘোষিত অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তিটিকে স্থায়ী শান্তিচুক্তিতে রূপ দেওয়ার জন্য এই পরমাণু আলোচনাকে পরবর্তী বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছিল। অন্যদিকে তেহরানের দাবি, হরমুজ প্রণালি সংক্রান্ত চুক্তি লঙ্ঘন করছে ওয়াশিংটন নিজেই। পাশাপাশি লেবানন থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারসহ যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নে যুক্তরাষ্ট্র ব্যর্থ হয়েছে বলে তারা অভিযোগ করছে। ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর নিয়ার ইস্ট পলিসির সামরিক ও নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিচালক এবং সাবেক মার্কিন সামরিক বিশ্লেষক মাইকেল আইজেনস্টাট বলেন, 'ট্রাম্প যা-ই বলুন না কেন, আমরা এখনো আলোচনার প্রক্রিয়ার মধ্যেই রয়েছি।' যুদ্ধবিরতির মূল ভিত্তি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) শেষ হয়ে গেছে বলে ঘোষণা দেওয়াটাও একধরনের আলোচনার কৌশল বলে মন্তব্য করেন তিনি। তবে ট্রাম্প প্রকাশ্যেই যুদ্ধবিরতি টিকিয়ে রাখার ব্যাপারে অনীহা প্রকাশ করে বলেন, 'আমি মনে করি এটি শেষ।' আঙ্কারায় ন্যাটো সম্মেলনে তিনি বলেন, 'আমরা চাইলে আলোচনা চালিয়ে যেতে পারি, তবে আমি নিশ্চিত নই, আমি আর কোনো চুক্তি করতে চাই কি না।' ইরানের প্রধান আলোচক ও পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেন, ট্রাম্প প্রশাসন বারবার প্রাথমিক চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করেছে, যার ফলে তাদের উপযুক্ত জবাব দিতে বাধ্য হয়েছে। আগের আলোচনার কৌশলের দিকে ফিরে তাকালে দেখা যায়, গত এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে প্রথম দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি হওয়ার আগেও ট্রাম্প তাঁর হুমকি জোরদার করেছিলেন। মার্কিন বাহিনী ইরানের সেতু, সড়ক ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে বোমা হামলা চালাবে বলে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লিখেছিলেন, 'আজ রাতে একটি আস্ত সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে, যা আর কখনোই ফিরে আসবে না।' গত মাসে যুদ্ধ অবসানের ৬০ দিনের সাময়িক চুক্তিতে পৌঁছানোর আগেও তিনি এই ধরনের চরম হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। ট্রাম্প সব সময় সুবিধাজনক অবস্থানে থেকে আলোচনা করতে পছন্দ করেন। এবারের নতুন হামলার মাধ্যমে তিনি হয়তো দর-কষাকষির বাড়তি সুবিধা খুঁজছেন। তবে যুদ্ধবিরতির সমাপ্তি ঘোষণা করায় ইরানও সামরিকভাবে স্বাধীন হয়ে যেতে পারে, যা তেলের বাজার ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান বিষয়ক পরিচালক আলী বায়েজ মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে এবার এই হুমকি দেওয়ার কৌশলটি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তিনি বলেন, 'কূটনৈতিক পথ পুরোপুরি বন্ধ না করে সামরিক চাপ বাড়ানোর চেষ্টা স্পষ্ট। তবে জোরপূর্বক দর-কষাকষি একটি বিপজ্জনক খেলা। যেকোনো মুহূর্তে এই চাপ নিজস্ব গতি পেয়ে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নিতে পারে, যা এড়ানোর জন্যই মূলত এই সকল প্রচেষ্টা।' তবে বায়েজ এ-ও যোগ করেন, ইরানের এখনো আলোচনার টেবিলে ফেরার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। কারণ, সাময়িক চুক্তির আওতায় যে অর্থনৈতিক স্বস্তির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা তেহরানের এখন ভীষণ প্রয়োজন। এই সংকটের প্রভাব নিয়ে ট্রাম্প নিজেও দ্বিমুখী বার্তা দিয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি দাবি করে আসছিলেন, মার্কিন নাগরিকদের জন্য তেলের দাম বাড়ার বিষয়টি ইরানের ক্ষেত্রে তাঁর সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলবে না। কিন্তু পরে তিনি স্বীকার করেন, অর্থনৈতিক বিপর্যয় এড়াতেই তিনি অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তিতে রাজি হয়েছিলেন। তবে যুদ্ধের অনিশ্চয়তায় তেলের দাম বাড়লে মার্কিন নাগরিকদের জ্বালানির জন্য বাড়তি খরচ করতে হবে। এতে ট্রাম্পের দলের ওপর চাপ পড়তে পারে। ট্রাম্পকে এই হিসাবও মাথায় রাখতে হচ্ছে।
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার ইঙ্গিত ট্রাম্পের, কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি কার্যত শেষ বলে মন্তব্য করেছেন। তবে তিনি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ এড়ানোর আশা প্রকাশ করেছেন। অন্যদিকে মধ্যস্থতাকারীরা চুক্তি টিকিয়ে রাখতে সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। ট্রাম্পের এই অবস্থানকে বিশ্লেষকরা দর-কষাকষির কৌশল হিসেবে দেখছেন।




