যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে সম্পদ হস্তান্তরের এক নতুন চিত্র উঠে এসেছে ব্যাংক অফ আমেরিকার (বিওএফএ) এক সমীক্ষায়। গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৬ সালে ধনী আমেরিকানদের মধ্যে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া ব্যবসার পরিমাণ ক্রয়কৃত ব্যবসার চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি হবে। বিওএফএর প্রাইভেট ব্যাংক স্টাডি অফ ওয়েলদি আমেরিকানস শীর্ষক এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছর উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত ব্যবসার হার ২৩ শতাংশে পৌঁছাবে, যেখানে ক্রয়কৃত ব্যবসার হার থাকবে মাত্র ১১ শতাংশ। ২০২২ সালে এই অনুপাত ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন; ওই বছর ২৮ শতাংশ ব্যবসা ক্রয় করা হয়েছিল, আর মাত্র ৫ শতাংশ উত্তরাধিকারসূত্রে গিয়েছিল।

এই পরিবর্তন তথাকথিত ‘গ্রেট ওয়েলথ ট্রান্সফার’ বা মহা সম্পদ হস্তান্তরের একটি অংশ। বেবি বুমার প্রজন্মের হাত ধরে আগামী দুই দশকে ৩৬ থেকে ১২৪ ট্রিলিয়ন ডলার সম্পদ অল্পবয়সী প্রজন্মের কাছে স্থানান্তরিত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই বিপুল পরিমাণ সম্পদ মূলত শীর্ষ ধনী ব্যক্তিদের কাছ থেকে আসছে, কারণ সম্পদের সিংহভাগই সমাজের উচ্চবিত্তের হাতে কেন্দ্রীভূত।

এমআইটি স্লোন স্কুল অফ ম্যানেজমেন্টের আর্থিক অর্থনীতির অধ্যাপক জোনাথন পার্কার এই প্রবণতাকে অর্থনীতিতে সম্পদ আরও কেন্দ্রীভূত হওয়ার লক্ষণ হিসেবে দেখছেন। তার মতে, উত্তরাধিকারসূত্রে ব্যবসা পাওয়ার হার বেড়ে যাওয়া একটি ‘কে-আকৃতির অর্থনীতির’ ইঙ্গিত দেয়, যেখানে ধনীরা আরও ধনী হচ্ছে এবং দরিদ্ররা জীবনধারণের জন্য হিমশিম খাচ্ছে। সেন্ট লুইস ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ ১ শতাংশ পরিবারের কাছে দেশের মোট সম্পদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ রয়েছে, যার পরিমাণ প্রায় ৪৪ ট্রিলিয়ন ডলার, যা নিচের ৯০ শতাংশ পরিবারের সম্মিলিত সম্পদের সমান।

পার্কার আরও বলেন, যে পরিবারে যত কম সন্তান থাকে, তাদের মধ্যে সম্পদ তত বেশি কেন্দ্রীভূত হয়। শিল্পবিপ্লবের সময় থেকেই এই ধারা বিদ্যমান। বর্তমানে উত্তরাধিকারসূত্রে ব্যবসা পাওয়ার বর্ধিত হার আরেকটি প্রবণতার সঙ্গেও যুক্ত: কোম্পানিগুলো দীর্ঘদিন ব্যক্তিমালিকানাধীন থাকছে। অ্যাপোলোর প্রধান অর্থনীতিবিদ টরস্টেন স্লোক উল্লেখ করেছেন, ২০২২ সালে ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার বাড়ানো শুরু করার পর থেকে কোম্পানিগুলোর পাবলিকলি লিস্টেড হওয়ার গড় বয়স বেড়েছে। ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ও প্রাইভেট ইক্যুইটির মাধ্যমে বিপুল তহবিল সংগ্রহ সম্ভব হওয়ায় অনেক বড় কোম্পানি পাবলিক মার্কেটের পরিবর্তে বেসরকারি মাধ্যমেই অর্থ সংগ্রহ করছে।

উত্তরাধিকার কর কাঠামোর পরিবর্তনও এই প্রবণতাকে উৎসাহিত করছে। গত ২৫ বছরে যুক্তরাষ্ট্র উত্তরাধিকার কর ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে। সম্প্রতি ‘ওয়ান বিগ বিউটিফুল বিল অ্যাক্ট’-এর মাধ্যমে প্রতি ব্যক্তির জন্য ছাড়ের পরিমাণ বেড়ে ১৫ মিলিয়ন ডলার হয়েছে। পাশাপাশি, মূলধনী লাভের ওপর ‘স্টেপ-আপ ইন বেসিস’ সুবিধা বহাল রয়েছে, যা মালিকের জীবদ্দশায় বেড়ে যাওয়া সম্পদের ওপর কর হ্রাস করে। অধ্যাপক পার্কারের মতে, এই কর ছাড় মানুষকে তাদের সম্পদ দীর্ঘদিন ধরে রাখতে এবং উত্তরাধিকারীদের কাছে হস্তান্তর করতে উৎসাহিত করে।

বিওএফএর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যবসার মালিকদের একটি ‘উল্লেখযোগ্য অংশ’ তাদের ব্যবসা হস্তান্তরের কোনো পরিকল্পনা রাখে না। তবে সংখ্যাগরিষ্ঠই শেষ পর্যন্ত উত্তরাধিকারীদের কাছে ব্যবসার মালিকানা হস্তান্তরের বা বিক্রির ইচ্ছা পোষণ করেন। পার্কার মনে করেন, এটি ব্যাখ্যা করে কেন মানুষ তাদের ব্যবসা দীর্ঘদিন ধরে রেখে দেয় এবং পরে উত্তরাধিকারীদের কাছে দিয়ে দেয়। উত্তরাধিকারীরা তখন সেই ব্যবসা পাবলিক করতে, বিক্রি করতে বা নিজেদের কাছেই রাখতে পারেন।