মেহেরপুর জেলার গাংনী উপজেলার বেতবাড়িয়া গ্রামে এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে। সেখানে একটি বাড়ি নির্মাণের জন্য মাটি কাটার সময় শ্রমিকদের কোদালের আঘাতে ছয়টি ধাতব বস্তু বেরিয়ে আসে। পরবর্তীতে খবর পেয়ে সেনাবাহিনীর বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দল ওই এলাকায় অভিযান চালিয়ে মোট ৯৬টি মাইন উদ্ধার করে। উদ্ধার হওয়া মাইনগুলোর মধ্যে ১৭টি অ্যান্টি-ট্যাংক মাইন এবং ৭৯টি অ্যান্টি-পারসোনেল মাইন রয়েছে বলে জানা গেছে।

আজ বেলা দেড়টার দিকে যশোর সেনানিবাস থেকে বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দলটি ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। তারা প্রথমে মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে পুরো এলাকা পরীক্ষা করে তারপর খননকাজ শুরু করে। প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে চালানো অভিযানে একের পর এক মাইন উদ্ধার করা হয়। এ সময় এলাকার নিরাপত্তার জন্য পুলিশ ও বিজিবির সদস্যরা পুরো জায়গাটি ঘিরে রাখে। উদ্ধারকৃত মাইনগুলো নিষ্ক্রিয় করার জন্য সেনাবাহিনী পাশের মধুগাড়ি মাঠে নিয়ে যায়, সেখানে মাইনগুলো নিষ্ক্রিয় করার কাজ চলছে।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, অ্যান্টি-পারসোনেল মাইনের ওপর ৬৪ কেজি ওজনের চাপ পড়লেই তা বিস্ফোরিত হতে পারে। অপরদিকে, অ্যান্টি-ট্যাংক মাইন বিস্ফোরণের জন্য এর চেয়ে অনেক বেশি ভারী চাপের প্রয়োজন হয়। মাটি খুঁড়তে গিয়ে একসঙ্গে এত বিপুল সংখ্যক মাইনের সন্ধান পাওয়ায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। সেনাবাহিনী ও পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় যুদ্ধকালীন কৌশলগত কারণে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এই মাইনগুলো মাটিতে পুঁতে রেখেছিল।

স্থানীয় প্রবীণ ও সাবেক প্রধান শিক্ষক মশিউর রহমান জানান, বেতবাড়িয়া গ্রাম থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরের বেংগাড়ি মাঠে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ক্যাম্প ছিল। ১৯৭১ সালে ওই এলাকায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে তুমুল লড়াই হয়। মুক্তিবাহিনীর প্রবল আক্রমণের মুখে পাকিস্তানি বাহিনী এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় এই মাইনগুলো পুঁতে রেখে যেতে পারে। স্থানীয় কয়েকজন বীর মুক্তিযোদ্ধার বরাতেও জানা গেছে, যে স্থানে মাইনগুলো পাওয়া গেছে তার মাত্র আড়াই কিলোমিটার দূরে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার ধর্মদহ গ্রামের বেংগাড়ি মাঠে ১৯৭১ সালের ১১-১২ নভেম্বর মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে হানাদার বাহিনীর সম্মুখযুদ্ধ হয়। ওই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে বীর প্রতীক খেতাবপ্রাপ্ত ওয়ালিউল হোসেনসহ বেশ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্রবাহিনীর সদস্য শহীদ হন। একপর্যায়ে মুক্তিবাহিনীর লাগাতার আক্রমণে দিশেহারা হয়ে পাকিস্তানি সেনারা বেতবাড়িয়া গ্রাম হয়ে কুষ্টিয়া সদরে পালিয়ে যায় এবং যাওয়ার সময় ওই পরিত্যক্ত স্থানে মাইনগুলো পুঁতে রেখে যায়।

বেংগাড়ি সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেওয়া বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মোস্তফা মুঠোফোনে জানান, দৌলতপুরের বেংগাড়ি হানাদার ক্যাম্পে তারা ভোরবেলা আক্রমণ করেছিলেন। হঠাৎ আক্রমণে হানাদার বাহিনী দিকশূন্য হয়ে গাড়ি ও ট্যাংক নিয়ে কুষ্টিয়ার দিকে পালিয়ে যায়। এরপর তারা ক্যাম্প দখল করে নেন। যে সড়কে এখন মাইন পাওয়া গেছে, সেই পথ ধরেই পাকিস্তানি বাহিনী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে পালিয়েছিল। কুষ্টিয়া যাওয়ার পথে খলিশাকুণ্ডি এলাকায় তাদের ওপর আবারও হামলা চালানো হয় এবং একটি সেতু বোমা দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া হয়।

উল্লেখ্য, গত শনিবার বেতবাড়িয়া গ্রামের প্রবাসী নুরুজ্জামান কালুর ৭ শতাংশ জমিতে বাড়ি নির্মাণের জন্য মাটি কাটছিলেন শ্রমিকেরা। এ সময় তাঁরা ছয়টি ধাতব বস্তু দেখতে পান, যেগুলোর গায়ে লেখা ছিল 'পি ডি এফ জি এল ৬৩, লট ৩৭, মাইন ১৯৬৭'। খবর পেয়ে পুলিশ এসে জায়গাটি ঘিরে ফেলে এবং নিরাপত্তা জোরদার করে। পরে সেনাবাহিনীর বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দলের সঙ্গে যোগাযোগ করে পুলিশ। জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) জামিনুর রহমান খান জানান, মাইনসদৃশ বস্তু দেখার পর পরই সেনাবাহিনীকে জানানো হয় এবং জায়গাটি পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়। মাইনগুলো উদ্ধার করে সেনাবাহিনী নিজেদের হেফাজতে নিয়ে গেছে এবং নিষ্ক্রিয় করার কাজ চলমান রয়েছে।