বাংলাদেশের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থায় উচ্চ রক্তচাপ এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে আক্রান্তের সংখ্যার দিক থেকে এটি শীর্ষস্থানীয় রোগ হিসেবে চিহ্নিত। উদ্বেগজনকভাবে, দেশের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এই রোগের বিস্তার দ্রুত বাড়ছে। সাম্প্রতিক এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ১৮ থেকে ৩৯ বছর বয়সী জনগোষ্ঠীর প্রায় ১২ শতাংশই উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত। দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসে অনিয়ম, শারীরিক শ্রমের অভাব, পরিবেশগত দূষণ এবং অস্বাস্থ্যকর জীবনধারাই তরুণদের এই রোগের কবলে পড়ার প্রধান কারণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাই ৩০ বছর বয়স পেরোনোর পর প্রত্যেকের বছরে অন্তত একবার উচ্চ রক্তচাপ পরীক্ষা করানো অত্যন্ত জরুরি বলে তারা অভিমত প্রকাশ করেছেন।

আন্তর্জাতিক যুব দিবস ২০২৬ উপলক্ষে মঙ্গলবার 'যুব সমাজে উচ্চ রক্তচাপ ঝুঁকি এবং করণীয়: বাংলাদেশ পরিপ্রেক্ষিত' শীর্ষক এক ওয়েবিনারে এসব গুরুত্বপূর্ণ মতামত তুলে ধরেন বক্তারা। প্রগতির জন্য জ্ঞান (প্রজ্ঞা) আয়োজিত এই ওয়েবিনারটি আয়োজনে সহায়তা করেছে গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটর (জিএইচএআই)। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরে বলা হয়, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে হৃদরোগজনিত কারণে প্রায় ২ লাখ ৮৩ হাজার ৮০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে ৫২ শতাংশের সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। এছাড়া দেশে মোট মৃত্যুর ৭১ শতাংশই ঘটে অসংক্রামক রোগের কারণে। তবে এই খাত মোকাবিলায় সরকারি বরাদ্দ এখনও প্রয়োজনীয় চাহিদার তুলনায় অনেক কম বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেন আলোচকরা।

ওয়েবিনারে মূল বক্তব্য দেন ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের এপিডেমিওলজি অ্যান্ড রিসার্চ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক সোহেল রেজা চৌধুরী। তিনি বলেন, হৃদরোগ, ক্যানসার, ডায়াবেটিস এবং শ্বাসতন্ত্রের রোগের মতো অসংক্রামক রোগগুলোই এখন বাংলাদেশের প্রধান স্বাস্থ্য সমস্যা। তামাক সেবন এবং খাবারে অতিরিক্ত চর্বি, চিনি ও লবণের ব্যবহার এই রোগগুলো বাড়ার পেছনে অন্যতম কারণ। তিনি আরও উল্লেখ করেন, অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে অসংক্রামক রোগে অকালমৃত্যুর হার বেশি। অধ্যাপক চৌধুরী বলেন, 'অন্য দেশগুলোতেও অসংক্রামক রোগে মানুষ মারা যায় বেশি। কিন্তু সেসব দেশে মানুষ মারা যায় সাধারণত ৭০ বছর বয়সের পর। অথচ আমাদের দেশে বেশির ভাগ লোকের হার্ট অ্যাটাক হচ্ছে ৫০ বছর বয়সের দিকে। তার মানে এটি অকালমৃত্যু…সেটাই হচ্ছে আমাদের জন্য বড় সমস্যা। এই রোগ মূলত আমাদের তরুণ প্রজন্মকে আক্রান্ত করছে।'

ব্র্যাক জেমস পি গ্রান্টস স্কুল অব পাবলিক হেলথের সেন্টার ফর নন কমিউনিকেবল ডিজিজ অ্যান্ড নিউট্রিশন বিভাগের পরিচালক অধ্যাপক মলয় কান্তি মৃধা উচ্চ রক্তচাপ মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগের ওপর জোর দেন। তাঁর মতে, রোগের প্রতিকার ও প্রতিরোধে স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। যারা ইতিমধ্যে আক্রান্ত হয়েছেন, তাদের চিকিৎসা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ওষুধের বিকল্প হিসেবে জীবনাচরণে পরিবর্তন আনার পরামর্শ দেন তিনি। স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়ে অধ্যাপক মৃধা বলেন, 'আমরা যদি স্বাস্থ্যকর খাবার খেতে পারি, তাহলে উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা অনেকটাই কমে যাবে। ফলমূল ও শাকসবজি বেশি খেলে এই প্রবণতা কমে।' সেই সঙ্গে নিয়মিত শরীরচর্চা, তামাক ও অ্যালকোহল পরিহার এবং বায়ুদূষণ থেকে নিজেদের রক্ষা করার পরামর্শও দেন তিনি।

সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও জিএইচএআই-এর বাংলাদেশ কান্ট্রি লিড মুহাম্মদ রূহুল কুদ্দুস তরুণদের মধ্যে ফাস্ট ফুডের প্রতি অত্যধিক আসক্তিকে দায়ী করেন। তিনি মনে করেন, এর ফলে তরুণদের মধ্যে স্থূলতা বাড়ছে, যা উচ্চ রক্তচাপের একটি মূল কারণ। এই সমস্যা মোকাবিলায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে হেলথ ক্লাব প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, 'হেলথ ক্লাবের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপনের ধারণা দেওয়া যায়। আর যাঁরা ইতিমধ্যে আক্রান্ত, তাঁদের এর চিকিৎসা সম্পর্কে সচেতন করা যেতে পারে।'

ওয়েবিনারের সমাপনী বক্তব্যে প্রজ্ঞার নির্বাহী পরিচালক এ বি এম জুবায়ের দেশের জনসংখ্যার ৩৫ শতাংশ তরুণ হওয়ার প্রেক্ষিতে এই সমস্যার গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, তরুণদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ উচ্চ রক্তচাপসহ নানা ধরনের অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত হচ্ছে এবং এই হার দিন দিন উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। সুস্থ তরুণ সমাজই উন্নত দেশের পূর্বশর্ত উল্লেখ করে তিনি বলেন, 'আমাদের তরুণ সমাজ যদি অসুস্থ থাকে, তাহলে তারা রাষ্ট্রের জন্য সম্পদ না হয়ে অনেক ক্ষেত্রে বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে।'

ওয়েবিনারে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের (বিএইচআরএফ) সহসভাপতি মোহাম্মদ আল আমিন, ভাইটাল স্ট্র্যাটেজিসের কনসালটেন্ট আমিনুল ইসলাম এবং বিভিন্ন যুব সংগঠনের প্রতিনিধিরা। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন প্রজ্ঞার প্রোগ্রাম অফিসার সামিহা বিনতে কামাল।