চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকারি ব্যয় সংকোচনের অংশ হিসেবে কঠোর নির্দেশনা জারি করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ। বুধবার প্রকাশিত এক পরিপত্রে উপসচিব থেকে শুরু করে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের কোনো সুদ ছাড়াই গাড়ি কেনার ঋণ বন্ধের পাশাপাশি নতুন মোটরযান ক্রয়, ভবন নির্মাণ ও ভূমি অধিগ্রহণে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, আধা স্বায়ত্তশাসিত, সংবিধিবদ্ধ সংস্থা, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান, করপোরেশন এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানি ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য এই নির্দেশনা প্রযোজ্য হবে। পরিচালন ও উন্নয়ন—উভয় বাজেটের জন্যই আলাদাভাবে ব্যয় সাশ্রয়ের নীতিমালা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।
পরিচালন বাজেট থেকে নতুন মোটরযান কেনা পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে দশ বছরের বেশি পুরোনো ও ব্যবহারের অনুপযোগী যানবাহন প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হলে অর্থ বিভাগের অনুমোদন নিতে হবে এবং সেক্ষেত্রে ফুল ইলেকট্রিক ভেহিকেল কেনাকে অগ্রাধিকার দিতে বলা হয়েছে। অন্যদিকে, নতুন ভবন নির্মাণেও কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে; যেসব আবাসিক ও অনাবাসিক ভবনের নির্মাণকাজ ৭০ শতাংশের কম সম্পন্ন, সেগুলোতে নতুন ব্যয় নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে।
পরিচালন বাজেট থেকে নতুন করে ভূমি অধিগ্রহণের অর্থছাড় বন্ধ থাকবে। পাশাপাশি সরকারি অর্থায়নে বিদেশে প্রশিক্ষণ, সেমিনার ও কর্মশালায় অংশগ্রহণ আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে। তবে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা বা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে এসব কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া যাবে। বিদেশে গিয়ে প্রিশিপমেন্ট ইন্সপেকশন বা ফ্যাক্টরি অ্যাকসেপটেন্স টেস্ট করার পরিবর্তে দেশে বা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত তৃতীয় পক্ষের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এ কাজ সম্পন্ন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
চলতি অর্থবছরের বাজেটে প্রশিক্ষণ বাবদ ৪ হাজার ৬২৮ কোটি, জ্বালানি তেল বাবদ ৩ হাজার ২৫১ কোটি এবং ভ্রমণ ও বদলি বাবদ ২ হাজার ৬৫৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। মূলধন ব্যয়ে ভূমি বাবদ ৬ হাজার ৭৩৩ কোটি, ভূমি উন্নয়ন বাবদ ২০৩ কোটি ও সরকারি কর্মচারীদের ঋণ বাবদ ৪৩০ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। গত ২ এপ্রিলের মন্ত্রিসভার বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, যার পরিপ্রেক্ষিতে এবার এই পরিপত্র জারি করা হলো।
পরিপত্র জারি প্রসঙ্গে অর্থ বিভাগের এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে প্রায়শই প্রয়োজন শুরুর আগেই অর্থ বরাদ্দ হয়ে যায় কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়নে দেরি হওয়ায় সেই অর্থ বছরের পর বছর অকার্যকর পড়ে থাকে। অথচ সরকারকে ওই অর্থের জন্য ঋণের সুদ দিতে হয়। তাই এখন প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থ ছাড় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সুদমুক্ত গাড়িঋণ বন্ধের বিষয়ে তিনি মন্তব্য করেন, এতে নতুন পদোন্নতি পাওয়া উপসচিবেরা কিছুটা বৈষম্যের শিকার হতে পারেন।
সরকারের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান। তার ভাষ্যমতে, নাগরিকেরা মূল্যস্ফীতির চাপে নিজেরাই খরচ কমাচ্ছেন এবং রাজস্ব সংগ্রহের বর্তমান অবস্থায় এমন নির্দেশনা যৌক্তিক। তিনি আরও বলেন, সংকোচন অর্থনীতির জন্য সব সময় ভালো নয়, তাই রাজস্ব আদায়ে গতি এলে এবং ব্যয় ব্যবস্থাপনা উন্নত হলে সরকার পরে এই পরিপত্র প্রত্যাহার করবে বলে তিনি আশাবাদী।




