জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক ও নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদের প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে তাঁর ব্যক্তিত্বের এক আবেগঘন দিক ফুটে উঠল ঘনিষ্ঠজন অভিনেতা ডা. এজাজের স্মৃতিচারণায়। 'হুমায়ূন স্যারের চোখে জল' শীর্ষক গ্রন্থে লিপিবদ্ধ একটি ঘটনা জানান দেয়, কীভাবে সৃষ্টিশীল মানুষের সংবেদনশীলতা তুচ্ছ আপাত-কারণেও গভীর আবেগের জন্ম দিতে পারে।

ঘটনার সূত্রপাত 'শ্রাবণ মেঘের দিন' চলচ্চিত্রের নির্মাণকালে। ডা. এজাজকে তখন শুটিং স্পটের যাবতীয় দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল—শিল্পীদের থাকা-খাওয়া, পরিবেশ রক্ষা, সময়ানুবর্তিতা সবকিছুই তিনি সামলাচ্ছিলেন। একদিন খাবার পরিবেশনের সময় একজন অভিনেতা তেলে ভাজা খাবার খেয়ে পেটের গোলযোগের কথা জানালে পাশে থাকা হুমায়ূন আহমেদ তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখান। বাবুর্চির ব্যাখ্যা সত্ত্বেও তাঁর ক্ষোভ প্রশমিত হয়নি; বরং দায়িত্বপ্রাপ্ত ডা. এজাজকে উদ্দেশ করে তিনি প্রচণ্ড ধমক দিয়ে বলেন, 'সব দায়িত্ব কাউকে বুঝিয়ে দিয়ে এখান থেকে চলে যান।'

এতে হতবিহ্বল ডা. এজাজ কোনো প্রতিবাদ না করেই দায়িত্ব হস্তান্তর করে অপমানিত বোধে লোকেশন ত্যাগ করেন। পরবর্তীতে সহকারী পরিচালক শামীমা নাজনীনের কাছে নিজের অভিমান প্রকাশ করে তিনি জানান, ওই অভিনেতার অসুস্থতার পেছনে খাবারের চেয়ে তার নিজের জাঙ্কফুড খাওয়ার ভূমিকা বেশি ছিল, অথচ এই সামান্য বিষয়ে তাঁকে অপদস্থ হতে হলো।

কিছুদিন পর একটি টেলিফিল্মের শুটিংয়ে ডা. এজাজকে ডাকা হলে প্রথম দুই দিন হুমায়ূন আহমেদ তাঁর সঙ্গে কোনো কথা বলেননি। তৃতীয় দিনে হঠাৎ সবাইকে সামনে ডেকে পরিচালক গাঢ় কণ্ঠে বললেন, 'দেখো ডাক্তার, তোমাকে আমি এত স্নেহ করি, তুমি সেটা এত দিনেও বুঝনি... আমি তোমাকে বেশি বকা দিই, কারণ আমি মনে করি, তোমার ওপরেই আমার অধিকার সবচেয়ে বেশি।'

হুমায়ূন আহমেদ আরও বলেন, ইউনিটের খাবারের সমালোচনা তাঁকে দারুণ কষ্ট দিয়েছিল, আর সেই রাগেই তিনি ডা. এজাজের ওপর মেজাজ হারিয়েছিলেন। চলে যাওয়ার নির্দেশ সত্ত্বেও ডা. এজাজ সত্যিই চলে যাওয়ায় তিনি বিস্মিত হন। এরপর উঠে দাঁড়িয়ে হুমায়ূন তাঁকে বুকে টেনে নেন। ডা. এজাজের বর্ণনায় উঠে আসে, 'আমি প্রথমে বুঝতে পারিনি, আমার চুল ভিজে যাচ্ছে কেন! ভাবলাম বৃষ্টি নামল কি না। তারপর বুঝলাম, হুমায়ূন স্যারের চোখে জল। তিনি আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কাঁদছিলেন।'

এই অশ্রুতে মিশে ছিল একজন নির্ভরযোগ্য সঙ্গীকে হারানোর ভয়, নিজের আচরণের অনুশোচনা এবং অপরিসীম স্নেহের বহিঃপ্রকাশ। ডা. এজাজের ভাষ্যে ফুটে ওঠে শিল্পীর অভিমানী হৃদয়ের ছবি, যিনি তাঁর সৃষ্টি ও সৃষ্টির সঙ্গে যুক্ত মানুষদের নিয়ে ভীষণ আন্তরিক ও গভীরভাবে সংবেদনশীল ছিলেন।

উল্লেখ্য, 'শ্রাবণ মেঘের দিন' বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে একটি মাইলফলক হিসেবে স্বীকৃত। ২০০০ সালে মুক্তি পাওয়া হুমায়ূন আহমেদ রচিত ও পরিচালিত এই ছবিটি সাতটি শাখায় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করে। ভাটির সংস্কৃতি, গ্রামীণ জীবন ও ময়মনসিংহের লোকসংগীতের চমৎকার মিশেলে ছবিটি দর্শকপ্রিয়তা পায় এবং বাণিজ্যিকভাবেও সফল হয়।