‘সুন্দরীতমা আমার... আমি তারায় তারায় রটিয়ে দেবো তুমি আমার’—জেমসের এই গানের লাইন যেন তরুণ প্রজন্মের আবেগের ভাষা হয়ে উঠেছে। নব্বইয়ের দশকের শেষভাগে ‘নগরবাউল’ অ্যালবামে প্রকাশিত ‘তারায় তারায় রটিয়ে দেবো’ গানটি এখনও সমান জনপ্রিয়। স্কুল-কলেজের কনসার্ট থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত মুহূর্ত—সব জায়গাতেই এই গান ধ্বনিত হয়। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, গানের এই ‘সুন্দরীতমা’ আসলে কে? কারও মতে এটি একটি রূপক, কারও মতে এটি প্রিয়তমার প্রতি সম্বোধন, আবার কেউ কেউ একে বাস্তব চরিত্র হিসেবে খুঁজতে গিয়ে ইতিহাস ঘাঁটেন।

গানের ‘সুন্দরীতমা’ শব্দটির প্রথম ব্যবহার দেখা যায় কবি শামসুর রাহমানের ‘উত্তর’ কবিতায়। সত্তরের দশকে লেখা এই কবিতায় ‘সুন্দরীতমা’কে ‘নিরুত্তর’ না থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। কবি লিখেছেন, ‘নীল আকাশ’, ‘ক্যামেলিয়া’, ‘জ্যোৎস্না’—যাকেই ‘তুমি’ বলো না কেন, তুমি আমার থাকবে নিরুত্তর। কিন্তু ‘মানুষ আমি’ যদি বলি ‘তুমি একান্ত আমার’, তখন আমি কি নির্বাক থাকতে পারব? আমি তো তারায় তারায় রটিয়ে দেবো যে তুমি আমার। জেমস কবিতাটি থেকে গান বানানোর অনুমতি নেন ১৯৯৫ সালে। শামসুর রাহমান সম্মতি দিলে তিনি ‘উত্তর’ কবিতার ভিত্তিতে ‘তারায় তারায় রটিয়ে দেবো’ গানটি তৈরি করেন।

শুধু বাংলা সাহিত্য নয়, ফরাসি কবি শার্ল বোদলেয়ারের কবিতায়ও ‘সুন্দরীতমা’র উল্লেখ পাওয়া যায়। বুদ্ধদেব বসু অনূদিত বোদলেয়ারের ‘স্ত্রোস্ত্র’ কবিতায় লেখা হয়েছে, ‘প্রিয়তমা, সুন্দরীতমারে, / যে আমার উজ্জ্বল উদ্ধার– / অমৃতের দিব্য প্রতিমারে, / অমৃতেরে করি নমস্কার।’ তবে শামসুর রাহমানের ‘উত্তর’ কবিতার সঙ্গেই জেমসের গানের সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে।

প্রায় দুই দশক আগে একটি সাবানের বিজ্ঞাপনেও ‘সুন্দরীতমা’ চরিত্রটি ব্যবহৃত হয়েছিল। নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী সেই বিজ্ঞাপনটি তৈরি করেন। এতে ‘সুন্দরীতমা’ চরিত্রে অভিনয় করেন শ্রাবস্তী দত্ত তিন্নী। বিজ্ঞাপনটিতে কণ্ঠ দেন এস আই টুটুল। সোশ্যাল মিডিয়ায় এখনও অনেকেই সেই বিজ্ঞাপনের ক্লিপ শেয়ার করে স্মৃতিচারণা করেন। বিজ্ঞাপনে দেখা যায়, এক তরুণী সমুদ্রসৈকতে দাঁড়িয়ে হাসছেন, দোলনায় দোল খাচ্ছেন, ফুটবলে পা দিচ্ছেন—এসবের মধ্য দিয়ে তাকে চিত্রিত করা হয়। শেষে এক তরুণ এসে বলেন, ‘সুন্দরীতমা, আমি জানি তোমার রূপের রহস্য কী?’

শামসুর রাহমানের কবিতায় ‘সুন্দরীতমা’র উৎপত্তি হলেও এটি রক্তমাংসের কোনো মানুষ কিনা, তা স্পষ্ট নয়। বুদ্ধদেব বসুর ‘একখানা হাত’ কবিতার মতো কোনো নির্দিষ্ট প্রেরণার উল্লেখ নেই। তবে জেমসের গানের মাধ্যমে শব্দটি এতটাই জনপ্রিয় হয়েছে যে এটি এখন প্রেম ও ভালোবাসার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভবিষ্যতেও কেউ যখন কাউকে ভালোবাসবেন, তখন হয়তো আবারও গুনগুন করে গেয়ে উঠবেন, ‘সুন্দরীতমা আমার... আমি তারায় তারায় রটিয়ে দেবো তুমি আমার।’