২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ নিষেধাজ্ঞার মুখেও রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা ফেরত আনার চেষ্টায় মাঠে ফিরতে চাইছে। দলীয় সূত্র অনুযায়ী, ফেরার এই প্রচেষ্টার মূল ভিত্তি হলো তৃণমূল নেতাদের সাংগঠনিকভাবে চাঙা করা, ভিন্ন ভিন্নভাবে রাজপথে কর্মসূচি পালন এবং ভার্চুয়াল মাধ্যমে বর্তমান সরকার ও অভ্যুত্থানকে চ্যালেঞ্জ করে প্রচারণা বাড়ানো। তবে যে বাস্তবতায় দলটি বর্তমান পরিস্থিতির সম্মুখীন, তার সাথে অভিযোজিত হওয়া বা আগের ভুলত্রুটি নিয়ে আত্মবিশ্লেষণের কোনো স্পষ্ট উদ্যোগ এখনও তাদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে না।
৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর দলের সভাপতি শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেন এবং এখনও সেখানেই অবস্থান করছেন। তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আদালত মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছে। সরাসরি জনসমক্ষে না আসলেও তিনি দেশ-বিদেশের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে অনলাইনে ধারাবাহিক যোগাযোগ বজায় রেখেছেন। জেলা, উপজেলা, থানা ও বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের নেতাদের সাথে ভার্চুয়াল সভা করে নানা নির্দেশনা দিচ্ছেন।
প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, দেশের অন্তত ১৭টি জেলার উপজেলা, থানা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে নতুন কমিটি গঠন অথবা দায়িত্ব পুনর্বণ্টনের খবর পাওয়া গেছে। অনেক জায়গায় পুরোনো কমিটি ভেঙে দিয়ে আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছে, আবার কোথাও ‘সমন্বয়কারী’ বা ‘দায়িত্বপ্রাপ্ত’ নামে নেতৃত্ব দেওয়া হচ্ছে। এই কমিটিগুলোর বেশিরভাগই অনলাইনে অনুমোদন বা ঘোষণা করা হয়েছে। চলতি মাসে শেখ হাসিনা প্রথমবারের মতো ঘোষণা দেন যে, তিনি আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফিরবেন এবং বিচারের সম্মুখীন হবেন। একইসঙ্গে আত্মগোপনে থাকা অন্যান্য নেতাদেরও ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন। দলীয় সূত্র বলছে, তার এই সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনের ঘোষণাকে কেন্দ্র করেই তৃণমূলে সংগঠন গোছানোর এই তৎপরতা জোরদার হয়েছে।
ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দলটির সামনে দুটি পথ খোলা ছিল। প্রথমটি হলো বর্তমান অবস্থার কারণ অনুসন্ধান করে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক সংস্কারের পথে হাঁটা। দ্বিতীয়টি হলো পুরোনো কাঠামো অক্ষুণ রেখে নেটওয়ার্ক সচল রাখা এবং সুবিধাজনক রাজনৈতিক পরিবেশের জন্য অপেক্ষা করা। অদ্যাবধি দলটির তৎপরতায় দ্বিতীয় পথের আধিপত্যই স্পষ্ট। কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে গত ডিসেম্বরে, কিন্তু নতুন নেতৃত্ব বা সংস্কারের কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই। কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব পরিবর্তন না করে তৃণমূলে কমিটি পুনর্গঠন, ভার্চুয়াল যোগাযোগ জোরদার এবং মাঠপর্যায়ে সক্রিয়তা বজায় রাখার উপরেই জোর দেয়া হচ্ছে।
নতুন কমিটিগুলোতে নেতা বাছাইয়ের ক্ষেত্রে চারটি বিষয় প্রধান্য পাচ্ছে। এগুলো হলো: কারাগার থেকে জামিনে বেরিয়ে সক্রিয় হওয়া নেতা, বিএনপি বা জামায়াতের সাথে আত্মীয়তা বা সম্পর্কের জেরে এলাকায় থাকতে পারা ব্যক্তি, স্থানীয় প্রভাবশালী মানুষ, এবং কারাগারে থাকা বা বিদেশে অবস্থানকারী নেতাদের আর্থিক জোগান দেওয়ার ক্ষমতা। সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের অধীন মোহাম্মদপুর, শেরেবাংলা নগর, আদাবর ও কাফরুল থানার আহ্বায়ক কমিটি ঘোষিত হয়েছে। এছাড়া উত্তরের ২৩টি ওয়ার্ডে কমিটি করা হয়েছে। সরকারি তিতুমীর কলেজ ছাত্রলীগের এক বছর মেয়াদি কমিটি গত ১৭ জুলাই অনলাইনে ঘোষিত হয়। পাবনা ও সিরাজগঞ্জ জেলা ছাত্রলীগেরও নতুন কমিটি গঠন করা হয়েছে।
যোগাযোগ ব্যবস্থার এক বড় পরিবর্তনে টেলিগ্রামসহ বিভিন্ন অনলাইন মাধ্যমে তৃণমূলের কম পরিচিত নেতারাও এখন সরাসরি শেখ হাসিনার সাথে সংযুক্ত হতে পারছেন। এতে করে তারা জেলা, মহানগর বা কেন্দ্রীয় পর্যায়ের নেতাদেরকে তেমন গুরুত্ব দিচ্ছেন না, যা দলীয় শৃঙ্খলায় অস্বস্তির জন্ম দিয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক দায়িত্বশীল নেতা মন্তব্য করেছেন, এর ফলে প্রচলিত সাংগঠনিক ধারা অমোঙ্গলিত হয়ে পড়েছে। এখন নেতা-কর্মীদের মূল্যায়নের মানদণ্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে ঝটিকা মিছিল করার সক্ষমতা, অনলাইন প্রচার ও ভার্চুয়াল সংযোগে সক্রিয় অংশগ্রহণ।
শেখ হাসিনা নেতাদের জানিয়ে দিয়েছেন, দলের বিপদের সময় যারা সক্রিয় আছেন তাদের কেন্দ্র করেই নতুন কমিটি সাজাতে হবে। বিচ্ছিন্নভাবে যারা মিছিল করছেন ও অনলাইনে যুক্ত, তারাই নেতৃত্বে অগ্রাধিকার পাচ্ছেন। তৃণমূল পুনর্গঠনে কিছু নতুন মুখ এলেও দলের রাজনৈতিক সংস্কৃতি বা দর্শন বদলের ইঙ্গিত খুব স্পষ্ট নয়। দলের দায়িত্বশীল নেতারা বলছেন, বর্তমান পদ্ধতি মূলত অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা ও সংগঠনের কাঠামো ধরে রাখার একটি কৌশল, ভবিষ্যতের অনুকূল রাজনৈতিক বাতাবরণের জন্য অপেক্ষা। তবে আত্মসমালোচনা ও সংস্কার ছাড়া শুধু কমিটি পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে হারানো জনগণের আস্থা ফের পাওয়া যাবে কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর আওয়ামী লীগের ভেতরেও এখনও অস্পষ্ট।




