পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সোমবার অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে নিজ পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে শান্তিপূর্ণভাবে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন স্যাম নিল। মৃত্যুর সময় তিনি ক্যানসারমুক্ত ছিলেন, তবে ২০২২ সালে তাঁর দেহে তৃতীয় ধাপের অ্যাঞ্জিওইমিউনোব্লাস্টিক টি-সেল লিম্ফোমা ধরা পড়েছিল। দীর্ঘ চিকিৎসার পর রোগটি নিয়ন্ত্রণে এলেও নিয়মিত চিকিৎসা নিতে হচ্ছিল তাঁকে। ১৯৪৭ সালে উত্তর আয়ারল্যান্ডের ওমাহ শহরে জন্মগ্রহণ করেন নিল। তাঁর প্রকৃত নাম ছিল নাইজেল জন ডারমট নিল। শৈশবে একই নামের অনেক সহপাঠী থাকায় ১২ বছর বয়সে তিনি নিজের নাম পরিবর্তন করে স্যাম রাখেন। ইংরেজ মা ও নিউজিল্যান্ডীয় বাবার সন্তান নিলের পরিবার ১৯৫৪ সালে নিউজিল্যান্ডে চলে যায়। আইন নিয়ে পড়াশোনা শুরু করলেও তা শেষ না করে থিয়েটারে যোগ দেন তিনি। ডাউনস্টেজ থিয়েটারে সপ্তাহে ৩৫ ডলার বেতনে কাজ শুরু করেন। কখনো কখনো পারিশ্রমিকের সঙ্গে দর্শকদের জন্য রান্না করা খাবারের অতিরিক্ত অংশও পেতেন।

১৯৭৭ সালের নিউজিল্যান্ড চলচ্চিত্র 'স্লিপিং ডগস' দিয়ে প্রথম আলোচনায় আসেন স্যাম নিল। এরপর 'মাই ব্রিলিয়ান্ট ক্যারিয়ার', 'প্রসেশন', 'এভিল অ্যাঞ্জেলস', 'দ্য হান্ট ফর রেড অক্টোবর'-এর মতো ছবিতে অভিনয় করে নিজের অবস্থান শক্ত করেন। ১৯৯৩ সালে তাঁর ক্যারিয়ারে সবচেয়ে বড় সাফল্য আসে। একই বছর 'দ্য পিয়ানো' এবং স্টিভেন স্পিলবার্গের 'জুরাসিক পার্ক'-এ অভিনয় করে বিশ্বব্যাপী খ্যাতি অর্জন করেন। উল্লেখ্য, 'জুরাসিক পার্ক'-এ ড. অ্যালান গ্রান্টের চরিত্রটি প্রথমে হ্যারিসন ফোর্ডকে প্রস্তাব করা হয়েছিল। পরে 'জুরাসিক পার্ক ৩' ও 'জুরাসিক ওয়ার্ল্ড ডোমিনিয়ন'-এও একই চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি।

পাঁচ দশকের ক্যারিয়ারে ১৫০টির বেশি চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন প্রযোজনায় অভিনয় করেছেন স্যাম নিল। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে 'ডেড কাম', 'দ্য জঙ্গল বুক', 'ইন দ্য মাউথ অব ম্যাডনেস', 'ইভেন্ট হরাইজন', 'বাইসেন্টিনিয়াল ম্যান', 'পিটার র‍্যাবিট' ইত্যাদি। টেলিভিশনেও সমান জনপ্রিয় নিল 'পিকি ব্লাইন্ডার্স'-এ দুর্নীতিগ্রস্ত মেজর চেস্টার ক্যাম্পবেল চরিত্রে অভিনয় করে প্রশংসা কুড়ান। ১৯৮৩ সালে 'রিলি, এইস অব স্পাইস' মিনিসিরিজের জন্য তিনি গোল্ডেন গ্লোব মনোনয়ন পান।

আশির দশকে জেমস বন্ড চরিত্রের অন্যতম শক্তিশালী প্রার্থী ছিলেন স্যাম নিল। ১৯৮৬ সালে তিনি স্ক্রিন টেস্ট দিয়েছিলেন, তবে শেষ পর্যন্ত চরিত্রটি পান টিমোথি ডাল্টন।

অভিনয়ের বাইরে নিউজিল্যান্ডের সেন্ট্রাল ওটাগো অঞ্চলে নিজের আঙুরখেত ও ওয়াইনারি পরিচালনা করতেন তিনি। রসবোধের জন্য পরিচিত নিল নিজের খামারের বিভিন্ন প্রাণীর নাম সহশিল্পীদের নামে রেখেছিলেন। একটি মুরগির নাম ছিল লরা ডার্ন, একটি হাঁসের নাম কাইলি মিনোগ, আর একটি গরুর নাম হেলেনা বোনহাম কার্টার।

ক্যানসারের সঙ্গে লড়াইয়ের সময় এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, 'মরতে আমার ভয় নেই, তবে বিষয়টা আমাকে বিরক্ত করবে। কারণ আমি আরও ১০-২০ বছর বাঁচতে চাই। নাতি-নাতনিদের বড় হতে দেখতে চাই, আমার লাগানো গাছগুলো বড় হতে দেখতে চাই।'

অভিনয়ে অবদানের জন্য ১৯৯১ সালে অর্ডার অব দ্য ব্রিটিশ এম্পায়ার, ২০০৭ সালে নিউজিল্যান্ডের ডিস্টিংগুইশড কম্প্যানিয়ন অব দ্য নিউজিল্যান্ড অর্ডার অব মেরিট এবং ২০২২ সালে নাইটহুড লাভ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তিনি চার সন্তান ও ছয় নাতি-নাতনি রেখে গেছেন।

অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্টনি আলবানিজ এক শোকবার্তায় বলেন, স্যাম নিল অসংখ্য প্রিয় অস্ট্রেলীয় গল্পের অংশ ছিলেন। তাঁর অভিনয়, রসবোধ ও ব্যক্তিত্ব তাঁকে দর্শকের হৃদয়ে বিশেষ স্থান করে দিয়েছে।